সুফল পেতে করতে হবে দীর্ঘ অপেক্ষা

প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা ওয়াসার দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার নির্মাণের কাজ শেষের দিকে। কিন্তু পয়োবর্জ্য শোধনাগার পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য এখন পর্যন্ত পাইপলাইন তৈরির (নেটওয়ার্ক) কাজই শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এতে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও শোধনাগারের সুফল পেতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হবে।প্রকল্প শুরুর আগে থেকেই ওয়াসা জানত, নেটওয়ার্ক ছাড়া শোধনাগারটি অব্যবহৃত ফেলে রাখতে হবে। এমন প্রকল্প গ্রহণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।অধ্যাপক আকতার মাহমুদ, সাবেক সভাপতি, বিআইপিনাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার একাধিক প্রকৌশলী বলেন, আফতাবনগরসংলগ্ন দাশেরকান্দি শোধনাগার নির্মাণে বর্তমানে যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, তাতে নেটওয়ার্ক নির্মাণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল না। নেটওয়ার্ক নির্মাণ একটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। পয়োবর্জ্যের নেটওয়ার্ক করতে কয়েক হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। এতে সময় লাগবে কয়েক বছর। নেটওয়ার্ক না থাকায় এখন প্রকল্প শেষে শোধনাগার ফেলে রাখতে হবে।

দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানীর বেশ কিছু এলাকার পয়োবর্জ্য পরিশোধন করে বালু নদে নিষ্কাশন করা হবে। এলাকাগুলোর মধ্যে গুলশান, বনানী, ডিওএইচএস, আফতাবনগর, বাড্ডা, মগবাজার, নিকেতন, কলাবাগান, ধানমন্ডি (একাংশ) ও হাতিরঝিল অন্যতম। এই প্রকল্পে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পয়োবর্জ্য পরিশোধনের মাধ্যমে ৫০ লাখ নগরবাসীকে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে বলে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।এটি ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। প্রকল্প শুরুর আগে থেকেই ওয়াসা জানত, নেটওয়ার্ক ছাড়া শোধনাগারটি অব্যবহৃত ফেলে রাখতে হবে। এমন প্রকল্প গ্রহণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

ঢাকার পয়োবর্জ্য পরিস্থিতি বদলাতে ২০১৩ সালে ঢাকা মহানগরের পয়োনিষ্কাশন মহাপরিকল্পনা তৈরি করে ওয়াসা। সে অনুসারে ঢাকার চারপাশের নদীদূষণ রোধে পাঁচটি শোধনাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দাশেরকান্দি শোধনাগারের নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১৫ সালে। ওই বছরের জুলাইয়ে শুরু হয়ে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে। শুরুতে প্রকল্পের খরচ ছিল ৩ হাজার ৩১৭ কোটি টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রকল্পের খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭১২ কোটি টাকা।
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পের অধীনে প্রগতি সরণিতে রামপুরা সেতুর পশ্চিম পাশে একটি বর্জ্য লিফটিং স্টেশন, রামপুরা থেকে আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি শোধনাগার পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ট্রাংক সুয়্যার লাইন (পয়োবর্জ্য পরিবহনের প্রধান লাইন) ও দাশেরকান্দিতে শোধনাগার নির্মাণ করা হবে। চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। কাজ বাস্তবায়ন করছে চীনা প্রতিষ্ঠান হাইড্রো চায়না করপোরেশন।প্রকল্পের মাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত নভেম্বর পর্যন্ত প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে ৭৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। তবে গত ৪ জানুয়ারি পাঠানো প্রশ্নের জবাবে ওয়াসা জানায়, প্রকল্পের নির্মাণকাজের অগ্রগতি প্রায় ৯৫ শতাংশ। চলতি বছরের জুন থেকে পয়ঃশোধনাগারের কার্যক্রম শুরু হবে।

ওয়াসা সূত্র জানায়, বর্তমানে ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন হাজার লিটার পয়োবর্জ্য উৎপন্ন হয়। ঢাকায় ৮৮১ কিলোমিটার পয়োনালা আছে। ঢাকার ২০ ভাগ এলাকা পয়োনালার আওতায় এসেছে। এর বাইরে ঢাকার আর কোনো এলাকায় পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই।ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেন, নেটওয়ার্ক তৈরি না করায় দাশেরকান্দি শোধনাগারটি যেসব এলাকার জন্য করা হচ্ছে, তারা সুফল পাবে না। এই শোধনাগারের আওতাভুক্ত এলাকায় পয়োনেটওয়ার্ক করতে চীনের অর্থায়নে একটি নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে। তার আগপর্যন্ত ঢাকায় বিদ্যমান যেসব নেটওয়ার্ক আছে, সেগুলোর সংযোগ দাশেরকান্দিতে দেওয়া হবে।দাশেরকান্দি প্রকল্পের পরিচালক মোহসিন আলী মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো সাড়া দেননি। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানকে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি জবাব দেননি। পরে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলে সেগুলোর জবাব পাঠান ওয়াসার উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা এ এম মোস্তফা তারেক।

লিখিত প্রশ্নের জবাবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানায়, দাশেরকান্দি শোধনাগার প্রকল্পের নির্ধারিত এলাকার জন্য পাইপলাইন নেটওয়ার্ক একটি আলাদা প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। ইতিমধ্যে নেটওয়ার্ক তৈরির জন্য একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, চীনের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নের জন্য তা প্রক্রিয়াধীন। এর আগপর্যন্ত হাতিরঝিলের দুই পাশের সীমানা বরাবর নির্মিত বিশেষ পয়োবর্জ্য ডাইভারশন অবকাঠামো (এসএসডিএস) থেকে আসা বর্জ্য শোধন করা হবে দাশেরকান্দিতে।ওয়াসার কর্মকর্তাদের অদূরদর্শিতার কারণে অর্থ ব্যয় করেও সুফল পাওয়া যাবে না বলে মনে করেন নগরবিদদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আকতার মাহমুদ। তিনি বলেন, এটি ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণের অর্থের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। প্রকল্প শুরুর আগে থেকেই ওয়াসা জানত, নেটওয়ার্ক ছাড়া শোধনাগারটি অব্যবহৃত ফেলে রাখতে হবে। এমন প্রকল্প গ্রহণের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

Leave a Comment