হায়াঃ নারীদের আসল সৌন্দর্য

সব নারীই সুন্দরী হতে চায়, অতি সুন্দরী হওয়া থাকে তাদের আকাঙ্ক্ষা।

কিন্তু আপনি যতই মেইক আপ বা কসমেটিক লাগান না কেন, হায়ার চেয়ে আর কোনো জিনিসই আপনাকে এতটা সুন্দরী করতে পারবে না।

হায়া নারীদের যে সৌন্দর্য প্রদান করে তার সাথে কোনো কিছুর তুলনা চলে না।

হায়া কি? হায়া হচ্ছে নিজের ভেতরের অধরা এবং বাহ্যিক বিনয়, নম্রতা, লজ্জাশীলতা, লাজুকতা। নিজেকে রক্ষার জন্য অশ্লীলতা এবং অনৈতিকতা থেকে বিরত থাকার সহজাত গুণ।

হায়া নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই। কিন্তু কোনো নারীর ভেতর হায়া না থাকলে সেটা একই সাথে দৃষ্টিকটু, শ্রুতিকটু ও বিরক্তিকর হয়।

যে নারী মোটামোটি সুন্দর কিন্তু তার হায়া আছে – তিনি শ্রেষ্ঠ সুন্দরী।

শারীরিকভাবে সুন্দরী নারী কিন্তু হায়ার অভাব আছে – এই নারী কুৎসিত।

আরবিতে একটা প্রবাদ আছে,

جمال بلا حياء وردة بلا عطر.

হায়াবিহীন সৌন্দর্য হচ্ছে সুগন্ধিহীন গোলাপের ন্যায়।

ঠনঠনে, শুণ্য, হতাশাজনক।

নারীত্বের নির্যাস থাকে না সেখানে।

গোলাপ যেমন নির্যাস লাভ করে তার সুঘ্রাণে, তেমনি নারীত্বের নির্যাস লুকায়িত থাকে তার সৌন্দর্যমণ্ডিত হায়ায়।

হায়া হল নারীত্ব।

আল্লাহ কুরআনে নারীসুলভ, হায়াসুলভ নারীদের কথা বলেছেন:

১. মারইয়াম عليها السلام:

মারইয়াম عليها السلام এর ভেতর প্রগ্রাঢ় হায়া ছিল। তিনি কোনো ফিরিশতাকে মানুষের রূপে দেখতে পেলেই নিজের হায়া রক্ষার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে যেতেন।

فَاتَّخَذَتۡ مِنۡ دُوۡنِهِمۡ حِجَابًا ۪۟ فَاَرۡسَلۡنَاۤ اِلَیۡهَا رُوۡحَنَا فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِیًّا ﴿۱۷﴾  قَالَتۡ اِنِّیۡۤ اَعُوۡذُ بِالرَّحۡمٰنِ مِنۡکَ اِنۡ کُنۡتَ تَقِیًّا ﴿۱۸﴾  قَالَ اِنَّمَاۤ اَنَا رَسُوۡلُ رَبِّکِ ٭ۖ لِاَهَبَ لَکِ غُلٰمًا زَکِیًّا ﴿۱۹﴾  قَالَتۡ اَنّٰی یَکُوۡنُ لِیۡ غُلٰمٌ وَّ لَمۡ یَمۡسَسۡنِیۡ بَشَرٌ وَّ لَمۡ اَکُ بَغِیًّا ﴿۲۰﴾

আর সে তাদের নিকট থেকে (নিজকে) আড়াল করল। তখন আমি তার নিকট আমার রূহ (জিবরীল) কে প্রেরণ করলাম। অতঃপর সে তার সামনে পূর্ণ মানবের রূপ ধারণ করল। মারইয়াম বলল, ‘আমি তোমার থেকে পরম করুণাময়ের আশ্রয় চাচ্ছি, যদি তুমি মুত্তাকী হও’। সে বলল, ‘আমি তো কেবল তোমার রবের বার্তাবাহক, তোমাকে একজন পবিত্র পুত্রসন্তান দান করার জন্য এসেছি’। মারইয়াম বলল, ‘কিভাবে আমার পুত্র সন্তান হবে? অথচ কোন মানুষ আমাকে স্পর্শ করেনি। আর আমি তো ব্যভিচারিণীও নই’। [সুরা মারইয়ামঃ ১৭-২০]

২. শুআইব আ.-এর কন্যা

মুসা আ. দুইজন নারীর পশুর পালকে পানি পান করান। এরপর তিনি জানতে পারেন তারা নবি শুআইব আ.-এর কন্যা। নারীদের একজন তার কাছে ফিরে এসে তাকে বলে যে উনার বাবা তাঁর সাথে কথা বলতে চান। কিন্তু মুসা আ.-এর নিকটে যাওয়ার সময় উনার ভঙ্গিমা কেমন ছিল? তিনি তাঁর দিকে কীভাবে হেঁটে গেলেন?

فَجَآءَتۡهُ اِحۡدٰىهُمَا تَمۡشِیۡ عَلَی اسۡتِحۡیَآءٍ ۫ قَالَتۡ اِنَّ اَبِیۡ یَدۡعُوۡکَ لِیَجۡزِیَکَ اَجۡرَ مَا سَقَیۡتَ لَنَا

অতঃপর নারীদ্বয়ের একজন লাজুকভাবে হেঁটে তার কাছে এসে বলল যে, আমার পিতা আপনাকে ডাকছেন, যেন তিনি আপনাকে পারিশ্রমিক দিতে পারেন, আমাদের পশুগুলোকে আপনি যে পানি পান করিয়েছেন তার বিনিময়ে’। [সুরা কাসাস : ২৫]

“تَمْشِى عَلَى ٱسْتِحْيَآءٍۢ” শব্দের আক্ষরিক অনুবাদ হল: “তিনি হায়ার উপরে চলছেন’।” তিনি তার আচার-ব্যবহার ও আচরণে এমন উচ্চ স্তরের হায়া’ অর্জন করেছেন যে, যখন তিনি হাঁটেন তিনি যেন হায়ার ওপরে থাকেন। এটাকে ভাষাগত অতিরঞ্জন বা রূপক বলা যায়, তার সুন্দর আচার-আচরণের মাত্রা বোঝানোর জন্য।’

এ ছাড়া, এই দুইজন নারীর একজন যখন মুসা আ.-কে বিয়ে করতে চাইলেন, তিনি কিন্তু সরাসরি বলেননি যে আমি ওনাকে বিয়ে করতে চাই। কারণ এটা বললে তার নারীসুলভ হায়া হ্রাস পেত। তাই তিনি ইঙ্গিতে তার বাবাকে বললেন যে আপনি মুসা আ.-কে কাজ দিন। তিনি মুসা আ.-এর শক্তি ও বিশ্বস্ততার প্রশংসা করলেন। এবং শুধু এই সূক্ষ্ম, পরোক্ষ মন্তব্য থেকেই তার পিতা তার বিনয়ী কন্যার মনের ইচ্ছা বুঝে ফেললেন এবং মুসা আ.-র সাথে বিয়ের আলোচনা শুরু করলেন।

قَالَتۡ اِحۡدٰىهُمَا یٰۤاَبَتِ اسۡتَاۡجِرۡهُ ۫ اِنَّ خَیۡرَ مَنِ اسۡتَاۡجَرۡتَ الۡقَوِیُّ الۡاَمِیۡنُ ﴿۲۶﴾

নারীদ্বয়ের একজন বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনি তাকে মজুর নিযুক্ত করুন। নিশ্চয় আপনি যাদেরকে মজুর নিযুক্ত করবেন তাদের মধ্যে সে উত্তম, যে শক্তিশালী বিশ্বস্ত’। [সুরা কাসাস : ২৬]

৩. রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী-গণ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধার্মিক, সম্মানিত স্ত্রীগণ সকলেই ছিলেন অপরিমেয় হায়ার অধিকারিণী।

  یٰنِسَآءَ النَّبِیِّ لَسۡتُنَّ کَاَحَدٍ مِّنَ النِّسَآءِ اِنِ اتَّقَیۡتُنَّ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِالۡقَوۡلِ فَیَطۡمَعَ الَّذِیۡ فِیۡ قَلۡبِهٖ مَرَضٌ وَّ قُلۡنَ قَوۡلًا مَّعۡرُوۡفًا ﴿ۚ۳۲﴾  وَ قَرۡنَ فِیۡ بُیُوۡتِکُنَّ وَ لَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ الۡجَاهِلِیَّۃِ الۡاُوۡلٰی وَ اَقِمۡنَ الصَّلٰوۃَ وَ اٰتِیۡنَ الزَّکٰوۃَ وَ اَطِعۡنَ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ ؕ اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰهُ لِیُذۡهِبَ عَنۡکُمُ الرِّجۡسَ اَهۡلَ الۡبَیۡتِ وَ یُطَهِّرَکُمۡ تَطۡهِیۡرًا ﴿ۚ۳۳﴾

হে নবী-পত্নিগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক-জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। [সুরা আহজাবঃ ৩২-৩৩]

হায়াসুলভ নারীরা কেমন হন তার একটি সুস্পষ্ট ছবি এখন আমাদের সামনে আছে। তবে হায়াসমৃদ্ধ নারীদের গুণগুলো আরো ভালোভাবে বুঝতে পয়েন্ট আকারে বিষয়টি উপস্থাপন করা যাকঃ

১. নারীর হায়া টের পাওয়া যায় তার কথাবার্তায়। তিনি নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে কথা বলেন। তেঁতোভাবে কথা উদ্ধতস্বরে কথা বলেন না। গালাগালি করেন না। এগুলো হায়ার বিপরীত।

২. তিনি সরলসোজাভাবে কথাবার্তা বলেন। কখনোই নির্লজ্জভাবে বা উদ্ধতভাবে কথা বলেন না।

৩. তিনি তার পবিত্রতা রক্ষা করেন। তিনি যৌন কেলেঙ্কারি, যৌন অনৈতিকতা, লালসা বা নির্লজ্জতার প্রদর্শন থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকেন।

৪. তিনি গায়রে মাহরামদের সাথে কথা বলেন না। গায়রে মাহরামদের সাথে কথা বলতে হলে তিনি তার গলার স্বর নরম করেন না অথবা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন না বা হাসাহাসি করেন না। নিজের নারীত্বের এই কোমল অংশের প্রদর্শন তিনি তার স্বামী ও আত্মীয়স্বজনদের জন্য জমা রাখেন।

৫. তিনি গায়রে মাহরামদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলেন। তিনি তাদের কাছে যান না। তাদের আশেপাশে হাঁটাচলা করেন না। আর কখনো প্রয়োজনের খাতিরে করতে হলে তিনি এমনভাবে চলাফেরা করেন যেভাবে চলেছিলেন শুআইব আ.-এর কন্যা।

৬. তিনি গায়রে মাহরাম পুরুষদের দিকে তাকিয়ে থাকেন না। হায়ার একটি অংশ হচ্ছে নজর হিফাজত করা। তিনি গায়রে মাহরামদের চোখের দিকে তাকান না, তার দিকে খোলামেলাভাবে তাকান না। লোকটি যেন তার সাথে চোখাচোখি করতে না পারে এই ব্যাপারে সতর্ক থাকেন তিনি।

৭. তার চিন্তাভাবনা ও নিয়ত অত্যন্ত উঁচুমানের। তার হৃদয়ে খারাপ ইচ্ছা বা বিদ্বেষ নেই বা তার মনে অনৈতিক বা লম্পট চিন্তাভাবনা নেই।

৮. তিনি বাইরে থাকা অবস্থায় শান্তশিষ্ট ও ধীরস্থিরভাবে চলাফেরা করেন। কখনোই উঁচুস্বরে কথা বলেন না। অন্যের মনোযোগ আকর্ষিত হতে পারে এমনভাবে চলেন না। এর বিপরীত প্রান্তে থাকা নারীরা জনসম্মুখে চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করেন, জোরে জোরে কথা বলেন, উচ্চস্বরে হাসেন এমনকি তার বান্ধবীদের সাথে জোরে জোরে কথা বলেন।

৯. তিনি তার সৌন্দর্যের হিফাজত করেন। তার দেহ ও নারীসুলভ সৌন্দর্যকে হিজাবে আবৃত করেন বাইরে বের হওয়ার সময়। তিনি সতর্ক থাকেন যে তার চামড়া বা চুল যেন কোনো পরপুরুষের নজরে না পড়ে। তার কাপড় হয় লম্বা, ঢিলেঢালা। বর্তমানে অনেক নারীরা মুখ খোলা রেখে সেখানে মেকআপ করছে আবার মাথায় কাপড় চড়াচ্ছে, টাইট জিন্স পরছে নামকাওয়াস্তে হিজাবের ওপর। ব্যর্থ হিজাবের উদাহরণ এগুলো।

১০. তিনি সাধারণত ঘরের ভেতরেই থাকেন। কেবল মাত্র প্রয়োজনের খাতিরে তিনি বাসার নিরাপত্তা ও শান্তির গণ্ডি থেকে বাইরে বের হন। তিনি তার প্রায়োরিটি জানেন। সারাদিন তিনি বাইরে বাইরে হনহন করে ঘুরে বেড়ান না। বাড়ি তার জন্য কেবল ঘুমানোর জায়গা নয়। বরং বাড়িই তার রাজ্য যেখানকার রাণী তিনি।

এমন নারীই তো মর্যাদাপূর্ণ ও সাজসজ্জাময়।

এমন নারীই তাকওয়াবান ও ধার্মিক।

তিনিই ধারণ করেন ইমান ও তাকওয়া।

তার হায়া তাকে কেবল নারী থেকে নারীসুলভ কমনীয় ব্যক্তিত্বে রুপান্তরিত করে। এটি তার সৌন্দর্যকে সত্যিকারের সৌন্দর্যে পরিণত করে।

**উম্মু খালিদের লেখা অবলম্বনে

Leave a Comment

betvisa