রুদ্র রূপে তিস্তা, উদ্বাস্তু হচ্ছে বহু পরিবার

উজানের ঢলে কুড়িগ্রামের তিস্তা, ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে অববাহিকায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহের শেষের দিকে কিংবা দ্বিতীয় সপ্তাহে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এরই মধ্যে তিস্তার পানি হ্রাস-বৃদ্ধির চক্রে ভাঙনে রুদ্র রূপ নিয়েছে স্বল্প নাব্যের এই নদী। তীব্র ভাঙনে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা। ভিটে হারিয়ে উদ্বাস্তু হচ্ছে একের পর এক পরিবার।


‘বারে বারে ভাঙে, বছরে বছরে ভাঙে, মাইনষের জায়গাত যায়া থাকা নাগে, মাইনষের জায়গাত নিন্দ্ (ঘুম) পাড়া নাগে, খুব কষ্ট। চাউল ডাউল চাই না, হামাক নদীটা বান্দি দেউক, হামরা জায়গাত (নিজ বাড়িতে) নিন্দ্ পাড়মো।’ এভাবেই নিজেদের কষ্ট আর অসহায়ত্বের কথা বলছিলেন জেলার উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের তিস্তা পাড়ের গ্রাম পশ্চিম বজরার বাসিন্দা রাশেদা বেওয়া (৬৩)। ভাঙনে দিশেহারা এই নারীর দাবি, সরকার যেন নদীশাসনের মাধ্যমে তাদের বসতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

ঋণের টাকায় ২২ শতক জমি কিনেছিলেন। কেনার পর একবার চাষাবাদও করতে পারেননি। কিন্তু তিস্তার গ্রাসে অর্ধেকেরও বেশি জমি বিলীন হয়েছে। বাকিটুকু যেকোনও সময় বিলীনের অপেক্ষায়। সর্বগ্রাসী তিস্তার তীরে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে মুছতে এমনটাই জানালেন রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের রামহরিগ্রামের সালেহা খাতুন।

শুধু উলিপুরের রাশেদা বেওয়া কিংবা রাজারহাটের সালেহা খাতুন নন, তিস্তাপাড়ে এমন আহাজারি করা মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সেখানকার বাতাস এখন দুর্গত মানুষের হাহাকারে ভারী হচ্ছে। এরই মধ্যে বন্যার হাতছানি তাদের কপালে দুশ্চিন্তার রেখা আরও স্পষ্ট করে তুলছে। সন্তান ও পরিবার নিয়ে তারা উদ্বিগ্নভাবে দিনাতিপাত করছেন।

তবে তিস্তার ভাঙনে শুধু বসতিই হারাচ্ছেন না এর অববাহিকার বাসিন্দারা। আবাদি জমি, গ্রামীণ সড়ক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন স্থাপনা বিলীন হচ্ছে তিস্তার গর্ভে। ভাঙন চলছে ব্রহ্মপুত্র ঘেরা উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নেও। ভাঙন প্রতিরোধে স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষ বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবে খুব একটা কাজে আসছে না। স্থানীয়দের অভিযোগ, নামমাত্র জিও ব্যাগ ফেলছে পাউবো। নদী তীরে জিও ব্যাগ ফেললেও সেগুলোর ভেতরে পর্যাপ্ত বালু দেওয়া হচ্ছে না। ফলে নিমিষেই নদীরগর্ভে চলে যাচ্ছে সেসব জিও ব্যাগ। এতে সরকারের বরাদ্দ অর্থের অপচয় হচ্ছে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

এদিকে ধরলা অববাহিকায় ভাঙনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পানি। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে শিগগিরই এ নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়বে কয়েক হাজার মানুষ।


পাউবো, কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহের শেষের দিকে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। ফলে এই দুই নদ-নদী অববাহিকায় একটি স্বল্পমেয়াদি বন্যার সম্ভাবনা রয়েছে।


নদীভাঙনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলায় ২৫টি পয়েন্টে নদী ভাঙন চলছে। এর মধ্যে দুই-একটি পয়েন্ট বাদে বাকি অংশে ভাঙন প্রতিরোধমূলক কাজ চলছে।’


এদিকে, বন্যার আগাম পূর্বাভাসে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। সম্ভাব্য বন্যা মোকাবিলার বিষয়ে প্রস্তুতি নিয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন বন্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন বিভাগগুলো প্রস্তুত থাকে। বন্যা পরিস্থিতিতে প্রয়োজনে বন্যা কবলিত মানুষদের উদ্ধার করে যেন আশ্রয়কেন্দ্রসহ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া যায় সে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।


জেলা প্রশাসক বলেন, ‘উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের পর্যাপ্ত চাল এবং টাকা বরাদ্দ দেওয়া আছে। আশা করি আগামী ১০-১৫ দিন কোনও সমস্যা হবে না।’

By নিজস্ব প্রতিবেদক

রংপুরের অল্প সময়ে গড়ে ওঠা পপুলার অনলাইন পর্টাল রংপুর ডেইলী যেখানে আমরা আমাদের জীবনের সাথে বাস্তবঘনিষ্ট আপডেট সংবাদ সর্বদা পাবলিশ করি। সর্বদা আপডেট পেতে আমাদের পর্টালটি নিয়মিত ভিজিট করুন।

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *