যত যুদ্ধে জড়িয়েছে পুতিনের রাশিয়া

ভ্লাদিমির পুতিন। গোয়েন্দা থেকে প্রেসিডেন্ট। দুই যুগ হতে চলল রাশিয়ার শাসনক্ষমতায়। এই সময়ের বিশ্বের নানা প্রভাবশালী নেতাকে ক্ষমতার মসনদে বসতে ও সরে যেতে দেখেছেন। বিশ্বের নানান দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করেছেন। আবার নানান ঘটনায় বিতর্কে জড়িয়েছেন। তাঁকে নিয়ে আগ্রহও অনেকের।১৯৯১ সালে ইউরোপ ও এশিয়ার মানচিত্র গেল বদলে। ভেঙে গেল সোভিয়েত ইউনিয়ন। মিখাইল গর্বাচেভের, বরিস ইয়েলৎসিনের পর দেশটির লাগাম ‘লৌহমানব’ ভ্লাদিমির পুতিনের হাতে। নানাভাবে হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন তিনি, এর মধ্যে যুদ্ধ অন্যতম। অনেকেই বলেন, আবার কি সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র গড়তে চায় মস্কো। বরাবরই নাকচ করে আসছে ক্রেমলিন। ন্যাটোর সদস্যপদ পাওয়া নিয়ে ইউক্রেন সমস্যার শুরু। এরই পুতিন পূর্ব ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের দুই অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিয়েছেন। এরপর এসেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডার নিষেধাজ্ঞা।এত কিছুর পর আলোচনা, পুতিন আসলে কী চান? নানা প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে সর্বশেষ রুশ পদক্ষেপের মধ্যে। দেখে নেওয়া যাক পুতিনের সামরিক নানা পদক্ষেপের খতিয়ান।

চেচনিয়া যুদ্ধ
১৯৯১ সালে পতন সোভিয়েত ইউনিয়নের। সেই ধ্বংসস্তূপে জন্ম নেয় ‘রাশিয়ান ফেডারেশন’। আর এ সুযোগে স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেয় চেচনিয়া। স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করে ‘চেচেন রিপাবলিক অব ইচকেরিয়া’। কিন্তু ১৯৯৪ সালে ওই অঞ্চল ফিরে পেতে চেচেন বিদ্রোহীদের দমনে সেনা পাঠায় মস্কো। কিন্তু লড়াইয়ে পর ১৯৯৬ সালে পর্যুদস্ত হয় রুশ সেনারা, ফেরে দেশে। ওই যুদ্ধই পরিচিত পায় প্রথম ‘চেচেন ওয়ার’ নামে। আবার ১৯৯৯ সালে পুতিনের (তখন প্রধানমন্ত্রী) নেতৃত্বে আবার চেচনিয়ায় সৈন্য পাঠায় রাশিয়া। তুমুল যুদ্ধের পর ২০০০ সালে চেচনিয়ার রাজধানী গ্রোজনিকে কার্যত ধুলায় মিশিয়ে দেয় রাশিয়ার সেনারা। রুশরা জয় পায় দ্বিতীয় চেচেন যুদ্ধে। একই সঙ্গে বিশ্বরাজনীতিতে হারিয়ে যেতে আসেননি, জানান দেন পুতিন।

রাশিয়া-জর্জিয়া যুদ্ধ
২০০৮ সালে জর্জিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বেধে যায় রাশিয়ার। দক্ষিণ ওসেটিয়া নিয়ে সংঘাত শুরু। অঞ্চলটির দখল ছিল রুশপন্থী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের। হারানো এলাকার দখল ফিরে পেতে সেই বছরের আগস্টে অভিযান শুরু করে জর্জিয়ার সেনারা। রুশপন্থী বিদ্রোহীরা সহায়তায় পাল্টা হামলা চালায় রাশিয়ার সেনাবাহিনী। কয়েক দিনের যুদ্ধে প্রাণ যায় কয়েক হাজারের মানুষের। পরাজয় হয় একসময়ের সোভিয়েত অন্তর্ভুক্ত দেশ জর্জিয়ার। সাউথ ওসেটিয়া ও আবাকাজি প্রদেশকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করে রাশিয়া। এর পর থেকেই সেখানে সেনা মোতায়েন করে রেখেছে রাশিয়া। সামরিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকেরা জানান, এ হামলার জন্য পার্লামেন্টকে রাজি করিয়েছিলেন পুতিন।

সিরিয়ায় অভিযান
২০১৫ সালে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পক্ষ নিয়ে দেশটিতে সেনাবাহিনীর পাঠায় রাশিয়া। আইএস ও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আসাদের সেনাদের পক্ষ হয়ে প্রবল লড়াই চালিয়ে যায় রুশ যুদ্ধবিমানগুলো। মস্কোর সাহায্য আইএস এবং বিদ্রোহীদের ঘাঁটিগুলো কবজায় নেয় আসাদ বাহিনী। সেখানেও আমেরিকার প্রভাব ক্ষুণ্ন করতে চেষ্টা চালিয়েছে রাশিয়া ও ইরান।

ক্রিমিয়া যুদ্ধ
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই মস্কোবিরোধী মনোভাব ইউক্রেনে প্রবল। আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপের আরও কাছাকাছি চলে যায় দেশটি। ২০১৪ সালে ইউরোপের সহায়তায় আন্দোলনের ফলে গদি ছাড়তে হয় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানোকোভিচকে। জনতার রায়ে রাশ টানতে চেষ্টা চালায় রুশপন্থী ইয়ানোকোভিচ সরকার। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয় না। জবাবে ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজেদের দখলর নেয় রাশিয়া। অঞ্চল হারায় ইউক্রেন। তবে পুতিনের এ উদ্যোগের কারণে ক্রিমিয়া বিশ্বে খুব বেশি স্বীকৃতি পায়নি।
সাবেক সোভিয়েত সদস্যদেশ ইউক্রেন যোগ দিতে চায় ন্যাটো জোটে। আর এতে চটেছেন পুতিন। কারণ, এতে সীমান্তে ন্যাটো সৈন্যদের সমাবেশ ঘটবে। নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে রাশিয়ার। এটা নিয়ে চিন্তায় পুতিন। আর তা ঠেকাতে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে রাশিয়া। ইউক্রেন সমস্যা নিয়ে আমেরিকা, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমের দেশগুলো হুঁশিয়ার করেছে রাশিয়াকে। তবে সেসব উপেক্ষা করে ভ্লাদিমির পুতিন পূর্ব ইউক্রেনের রুশপন্থী বিদ্রোহীদের দুই অঞ্চল দোনেৎস্ক ও লুহানস্ককে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন।

গত সোমবার রাতে টেলিভিশন ভাষণে পুতিন ইউক্রেনকে রাশিয়ার ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, পূর্ব ইউক্রেন একসময় রাশিয়ার ভূমি ছিল। তিনি আত্মবিশ্বাসী, রাশিয়ার জনগণ তাঁর এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানাবে। আর স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতির পরই দোনেৎস্ক এলাকায় ট্যাংক দেখা গেল।সাবেক সোভিয়েত সদস্যদেশটিকে কোনোভাবেই ন্যাটো জোটে যোগ দিতে দেবে না রাশিয়া। পুতিনের এ ঘোষণার ফলে ক্রিমিয়ার পর আবার বিভক্ত হলো ইউক্রেন। এ অবস্থায় জরুরি বৈঠকে বসে জাতিসংঘের নিরাপত্তা বৈঠক। পরিস্থিতির মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদমির জেলেনস্কি। বিশ্লেষকদের ধারণা, সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের পুরোনো গৌরব ফিরিয়ে আনতে চান পুতিন। আর তাই দাবার খেলায় ইউক্রেন একটি ঘুঁটিমাত্র।

By নিজস্ব প্রতিবেদক

রংপুরের অল্প সময়ে গড়ে ওঠা পপুলার অনলাইন পর্টাল রংপুর ডেইলী যেখানে আমরা আমাদের জীবনের সাথে বাস্তবঘনিষ্ট আপডেট সংবাদ সর্বদা পাবলিশ করি। সর্বদা আপডেট পেতে আমাদের পর্টালটি নিয়মিত ভিজিট করুন।

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *