মানসিকভাবে শক্তিশালী লোকদের চারটি অভ্যাস

আপনার কি কখনো কখনো নিজেকে মানসিকভাবে অনেক বিক্ষিপ্ত লাগে? মন এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীনভাবে ছুটে বেড়ায়?

এ সময়টায় নিশ্চয়ই আপনার মনে হয় যে যদি আপনার মনটা আরো শান্ত থাকত, যত যা-ই ঘটুক যদি আপনি মানসিকভাবে স্থির থাকতে পারতেন?

আবেগ অনুভূত হওয়াটা খারাপ কিছু না। আমাদের আবেগের উত্থানপতন হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ অন্যদের চেয়ে তাদের আবেগিক প্রতিক্রিয়া আরো ভালোভাবে কন্ট্রোল করতে পারে।

এর পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। যেমন জেনেটিক থেকে শুরু করে আপনার প্রতিপালন এমনকি গত রাতে আপনি কতখানি ঘুমিয়েছেন তার ওপরও মানসিক অবস্থা নির্ভর করে। তবে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছেঃ আপনার অভ্যাস কিরকম তার ওপর নির্ভর করবে আপনি শক্তিশালী আবেগের মুখে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন।

আসুন আমরা পাঁচটি অভ্যাস নিয়ে আলোচনা করি যা আপনাকে মানসিকভাবে আরো শক্তিশালী করে তুলবেঃ

১. মেটাকগনিশন

মেটাকগনিশন মানে আপনার মনে যেসব চিন্তাভাবনা আসছে সেগুলো নিয়েই চিন্তাভাবনা করা।

আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, আপনার নিজের মনে কী ঘটছে – চিন্তা, আবেগ, বিশ্বাস, মেজাজ, প্রত্যাশা, স্ব-কথোপকথন ইত্যাদি সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সেগুলোকে মূল্যায়ন করার ক্ষমতা।

অধিকাংশ সময়েই আমাদের মন অটোপাইলট মোডে থাকে। কোনো একটা ঘটনা ঘটে আর আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাই।

আপনার বউ আপনার দিকে বিশ্রীভাবে তাকালে আপনিও একটা বিশ্রী মন্তব্য করে বসেন। আপনার বস আপনাকে ঝাড়ি মেরে কোনো মেইল পাঠালে সেটার জবাব কি দিবেন সেটা যখন বুঝতে পারেন না, তখন নিজেকে ফেইসবুকের জগতে ডুবিয়ে ফেলেন। কষ্টের অতীতের কোনো কথা মনে পড়ে গেলে আফসোস করতে বসে যান। আপনি নিজের মনকে যত এড়িয়ে চলবেন, আপনি তত প্রতিক্রিয়াশীল আচরণধর্মী হবেন।

এর কারণে আবেগের নানা উত্থানপতন ও মানসিক চাপ তৈরী হয়।

আপনি যদি সর্বদা খারাপ সম্ভাবনার কথা চিন্তা করেন এবং উদ্বিগ্ন বোধ করেন, অথবা আপনি যদি হতাশ এবং রাগান্বিত হয়ে সমালোচনার প্রতিক্রিয়া জানান, অথবা আপনি যদি নিজেকে দোষ দেন এবং খারাপ কিছু ঘটলে লজ্জিত বোধ করেন তবে এটি নেতিবাচক আবেগের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই কোনো কিছু ঘটলেই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না জানিয়ে একটু সময় নিন, নিজের চিন্তাভাবনাগুলো পর্যবেক্ষণ করুন। কীভাবে জবাব দেবেন বা প্রতিক্রিয়া জানাবেন তা ভাবুন। আপনার আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করার পরিবর্তে, সেগুলো সম্পর্কে কৌতূহলী হওয়ার চেষ্টা করুন।

“উদ্দীপনা এবং প্রতিক্রিয়ার মধ্যে একটি জায়গা রয়েছে। আমরা কেমন প্রতিক্রিয়া জানাব সেই জায়গাটিতে সেটা চয়েস করার ক্ষমতা রয়েছে। আমাদের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে আমাদের সমৃদ্ধি এবং স্বাধীনতা।”

– ভিক্টর ফ্রাঙ্কল

২. মনোযোগ সরিয়ে ফেলা

অধিকাংশ মানুষ তাদের মাথায় যা আসে বা তাদের মনোযোগ যা আকর্ষণ করে সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে সময় পার করে দেয়।

সোশ্যাল মিডিয়ায় সারাদিন স্ক্রল করে যাওয়া কিংবা নতুন গাড়ি কেনার ব্যাপারে ফ্যান্টাসিতে ভোগা – ইত্যাদি চিন্তায় আমাদের মন বুঁদ হয়ে থাকে। আমরা এসব চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করার তেমন প্রয়াসও চালাই না।

এখন সমস্যা হচ্ছেঃ আপনি যেসব বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা করবেন সেটাই নির্ধারণ করবে আপনার মুড কেমন হবে।

একবার ভেবে দেখুন,

যদি আপনি সবসময় ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন বোধ করেন, তাহলে উদ্বিগ্নতা আপনাকে গ্রাস করবে।

সর্বদা অতীতের ভুল নিয়ে ভাবলে লজ্জিত লাগবে।

আপনার সাথে কীভাবে জুলুম করা হয়েছে এটা ভাবলে বেশ রাগ রাগ লাগবে।

আপনার আবেগিক অবস্থা যদি পরিবর্তন করতে চান তাহলে আপনার চিন্তার বিষয়বস্তুও পালটাতে হবে।

এ কাজটা সহজ নয়। তবে এটা থেকে মুক্তি পেতে হলে, এবং ভাবনার কারণে যেসব কষ্টদায়ক অনুভূতি সৃষ্টি হয় সেটা থেকে বাঁচতে হলে আপনাকে অবশ্যই মনোযোগ নিয়ন্ত্রণ করা শিখতে হবে।

আপনার মনোযোগকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পেশির মতো। আপনি এটার এক্সারসাইজ না করলে এটা দুর্বলই থেকে যাবে। অর্থাৎ, তখন আপনার মনে যা আসবে আপনি সেটার পেছনেই পড়ে থাকবেন।

“বর্তমান মুহূর্তটি আনন্দ এবং সুখে ভরা। আপনি যদি মনোযোগী হন তাহলে এটা দেখতে পাবেন।”

– থিচ নাট হ্যান

৩. আত্ম-সহানুভূতি

যখন আপনি কষ্টের ভেতর দিয়ে বা বিপদের ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, তখন নিজেকে এমনভাবে ট্রিট দিন যেভাবে আপনি বন্ধুদের ট্রিট দেন।

অনেকের মধ্যেই একটা অদ্ভুত অভ্যাস আছে যে, যখন তারা কোনো ভুল করে তখন তারা নিজেদের প্রচণ্ডরকম দোষারোপ করে এবং নিজের প্রচুর সমালোচনা করে। এটা খুব আশ্চর্যের বিষয় বটে। কারণ অন্য কেউ যখন ভুল করে আমরা কিন্তু তার প্রতি ক্ষমাশীল এবং দয়ালু আচরণ করি।

দুঃখজনকভাবে আমরা অনেকেই এই চিন্তাচেতনা লালন করে বড় হয়েছি যে সফলতার “সূত্র” হচ্ছে নিজের ওপর কঠোর হওয়া। ঠিক যেমন কঠোর প্রকৃতির ড্রিল সার্জেন্ট নতুন রিক্রুটদের সাথে আচরণ করে। আমরা ভুলভাবে শিখেছি যে, নিজের ওপর কঠোর হলেই আমরা ব্যর্থতা এড়িয়ে চলতে পারব। কিন্তু এটা সত্য নয়…

আপনি যখন কোনো ভুল করার কারণে নিজের ওপর আরো কঠোর হবেন, তখন এটা আপনার ভেতর আরো যন্ত্রণার অনুভূতি বাড়াবে আগের যন্ত্রণা এবং স্ট্রেসের ওপর।

আপনি যদি কষ্টের অনুভূতি থেকে বেঁচে থাকতে চান, তাহলে নিজের ওপর কঠোর হওয়ার বদলে দয়ালু হোন।

“এটা কষ্টের মুহূর্ত। কষ্ট জীবনের অংশ। আমি যেন এই মুহূর্তে নিজের প্রতি সদয় হতে পারি। আমি যেন নিজের সাথে সহানুভূতিশীল হতে পারি।”

– ক্রিস্টিন নেফ

৪. মানসিক সহনশীলতা

কীভাবে বিভিন্ন আবেগ, অনুভূতির সাথে মানিয়ে চলবেন যাতে সেগুলো আপনার ক্ষতি না করতে পারে – এটা শিখতে পারার ভেতর আবেগিক শক্তি জড়িত।

কিন্তু প্রাথমিক অনুভূতিগুলো অনেক সময় এড়িয়ে চলা যায় নাঃ

আপনি যতই আত্ম-সহানুভূতিশীল হোন না কেন, ভুল করলে কষ্ট লাগবেই, লজ্জা আপনি পাবেনই।

যতই আত্ম-সচেতন হোন না কেন, আপনার কষ্টদায়ক অনুভূতিগুলো আপনাকে কষ্ট দেবেই।

নিজের মনোযোগ নিয়ন্ত্রণে যতই দক্ষ হোন না কেন, সময়ে সময়ে এখানে বাধার সৃষ্টি হবেই এবং আপনি উদ্বিগ্ন হবেন। এর মানে হচ্ছে…

খারাপ লাগলেও এই জীবনকে আপনার চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

ঠিক যেভাবে এখন দৌড়বিদ ক্লান্ত লাগা সত্ত্বেও নিজেগে এগিয়ে নিয়ে চলে কারণ তারা দৌড়টা শেষ করতে চায়, তেমনি খারাপ লাগা সত্ত্বেও আপনাকে জীবনে চলতে হবে।

কারণ, এর বাইরে কোনো বিকল্প আছে কি?

আপনি পারফেক্ট অনুভব করার আগ পর্যন্ত গুরত্বপূর্ণ কাজগুলো কি ফেলে রাখবেন? এটা করলে তো আপনি চিরদিন আলসেমি ও হতাশায় কাটাবেন।

মন খারাপ থাকলে ছোট ছোট কাজ করাও কঠিন হয়। কিন্তু এ জন্য মানসিক সহনশীলতা বাড়াতে হবে।

দৌড়বিদরা দৌড় শেষ করতে পারে কারণ তারা যদিও দীর্ঘসময় ধরে হাঁটছে, প্রচণ্ড ক্লান্তি ও ব্যথা তাদের পেয়ে বসেছে, তবুও তারা নিজেদের ভেতর যে সহনশীলতা ও মানসিক শক্তির সৃষ্টি করেছে, সেটাই তাদেরকে দৌড় থেকে থামা হতে রক্ষা করছে। প্রথমে তারা এক মাইল দৌড়ে প্র্যাকটিস করেছে। যখন এতে অভ্যস্ত হয়েছে তখন সেটা বাড়িয়ে পাঁচ মাইল করেছে। আরো শক্তিশালী হলে দশ মাইল, এভাবে দৌড়ের দৈর্ঘ্য বেড়েছে।

মানসিক সহনশীলতাও একইভাবে কাজ করে।

আপনি যদি খারাপ বোধ করাকে সহনীয় করে নিতে চান তাহলে আপনার খারাপ লাগাকে প্র্যাকটিসের ভেতর নিয়ে আসতে হবে। নিজের জীবনকে যেভাবেই হোক চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

তাই যখন পরের বার মন খারাপের অনুভূতি এসে হামলা করবে তখন এই প্রশ্ন করবেন না যে কীভাবে খারাপ লাগা এড়িয়ে চলা যায়? বরং প্রশ্ন করুনঃ কীভাবে আমি এই সুযোগকে নিজের মানসিক সহনশীলতা বাড়াতে কাজে লাগাতে পারি?

“যে ব্যক্তি পর্বতকে সরাতে চায় সে শুরু করে ছোট ছোট পাথর বহন করার দ্বারা।”

 

 

 

 

 

Leave a Comment