বুক রিভিউঃ অটোমেট ইউর বিজিওয়ার্ক – আয়তেকিন ট্যাঙ্ক

বর্তমানের আধুনিক বিশ্বে আমরা কম সময়ে অনেক বেশি কিছু করতে চাই। এই রকম দর্শন বিশ্বের ইতিহাসে আর কখনও দেখা যায়নি। দিন দিন আমাদের ইনবক্স আর মেসেজে মেইল এসে উপচে পড়েছে, সীমাহীন টু-ডু লিস্ট আমাদের সামনে, একের পর এক ডেডলাইন আমাদের এসে মনের দরজায় কড়া নাড়ছে। তাই কাজগুলোকে অটোমেট করে ফেলা এবং কর্মদক্ষতাকে সর্বোচ্চ করা আজ কেবল সুবিধা নয়, বরং প্রয়োজনীয়তায় পূরণ হয়েছে।

আসুন আপনাদেরকে পরিচয় করিয়ে দিই আয়তেনিক ট্যাঙ্কের সাথে। তিনি এক ভিশনারি। তিনি এটার প্রয়োজনীয়তাকে অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। শুধু বুঝেই তিনি ক্ষান্ত থাকেননি। বরং এটাকে বাস্তবায়ন করতে তিনি তার পুরো ক্যারিয়ারকে উৎসর্গ করেছেন। তিনি জটফর্ম নামক একটি কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতা এবং সিইও। এই কোম্পানির ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২ কোটির বেশি, কর্মী হিসেবে আছে ৬১৯ জনের শক্তিশালী এক দল। কিভাবে বিভিন্ন কাজকে অটোমেট করা যায় সেই দুনিয়াকেই বদলে দিয়েছেন আয়তেকিন। ফলে আমাদের শত শত ঘন্টা বেঁচে যাচ্ছে যা আরো অর্থপূর্ণ কাজে ব্যয় করা সম্ভব।

কিন্তু Aytekin এর যাত্রা শুধু সফ্টওয়্যারে সীমাবদ্ধন নয়। ট্যাঙ্ক একজন দক্ষ লেখকও। যার সাম্প্রতিক বই, “অটোমেট ইওর বিজিওয়ার্ক: ডু লেস, অ্যাচিভ মোর, এবং সেভ ইওর ব্রেন ফর দ্য বিগ স্টাফ” বিক্ষিপ্ততা এবং ইনফরমেশন ওভারলোডে ভরপুর বিশ্বে আপনাকে দেবে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ।

তিনি মূলত একজন ডেভেলপার। ফলে তার লেখায় টেকনিক্যাল বিষয়গুলোও চলেয়াসে। যার ফলে তিনি দারুণ দারুণ সব ন্যারেটিভ তার বইয়ে উপস্থাপন করেছেন যা সারা বিশ্বের পাঠককে অনুপ্রাণিত করছে। তিনি নিয়মিত লিখে থাকেন যেসব পাবলিকেশনে তার মধ্যে রয়েছে ফাস্ট কোম্পানি, অন্ট্রপ্রেনার এবং টেকক্রাঞ্চ ইত্যাদি। এখানে তিনি দারুণ দারুণ সব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। কারণ সেগুলোতে এসেছে নানা প্র্যাকটিক্যাল বিষয়। তিনি কেবল মুখে বলেই ক্ষান্ত নন। নিজে সেগুলো বাস্তবায়ন করেও দেখিয়েছেন।

অটোমেট ইওর বিজিওয়ার্ক হল একটি ব্যবহারিক বই যা আপনাকে দেখিয়ে দেবে যে কিভাবে আপনি অটোমেশনের শক্তি ব্যবহার করে পুনরায় জীবনের অর্থপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে পারবেন।

আমরা আধুনিক বিশ্বের শক্তিশালী এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে নিজেদের অনেক সময় বাঁচাতে পারি, যে সময়গুলো একসময় ক্লান্তিকর, একঘেয়ে, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে ব্যবহৃত হতো। সেই সময়টা বাঁচিয়ে আমরা সৃজনশীল, দক্ষতাপূর্ণ এবং গুরত্বপূর্ণ কাজ করতে পারি যা আমাদের কাজে বা কর্মক্ষেত্রে আরো ভ্যালু যোগ করবে।

আইডিয়াটা হচ্ছে, আমরা এমন অটোমেশন তৈরী করব না যা চাকরি দূর করবে। বরং আমরা এমন অটোমেশন তৈরী করব যা সময় বাঁচাবে এবং আমরা এমন আরো অনেক কাজ করতে পারব যা চাকরিতে আসলেই করা দরকার। এতে অগুরত্বপূর্ণ কাজ থেকে আমরা বেঁচে থাকতে পারব।

নিচে আমি অটোমেট ইউর বিজিওয়ার্ক বই থেকে কিছু উক্তি তুলে ধরব যা থেকে আপনি সময় বাঁচানোর আইডিয়ার ব্যাপারে আরো কিছু আইডিয়া পাবেন। ভালোমতো আইডিয়াটা বুঝতে পারবেন। মূল্যবান কাজে আপনি নিজের সময় ব্যয় করতে পারবেন। উক্তিগুলো ভালো লাগলে আপনিও ট্যাঙ্কের এই বইটি সংগ্রহ করতে পারেন।

আপনার উত্পাদনশীলতা বা প্রোডাক্টিভিটি মূল সমস্যা নয়। আমাদের মধ্যে অনেকেই প্রোডাক্টিভিটির এই মেসেজ মেনে নিয়েছে যে সাফল্যের জন্য একটি অতিমানবীয় কাজের নীতি প্রয়োজন। যখন ক্লান্তি এবং অতিরিক্ত কাজ করাকে করে ফেলা হবে, তখন ক্লান্ত হয়ে পড়াই স্বাভাবিক। আপনি সকালের রুটিন তৈরী করতে না পারা কিভাবে টু-ডু লিস্ট সম্পন্ন করতে না পারার জন্য আপনি নিজেকে দায়ী করেন। কিন্তু আপনার প্রোডাক্টিভিটি আপনার মূল সমস্যা না। মূল সমস্যা হচ্ছে, আপনি মনে করেন যে আপনাকেই সব কাজ করতে হবে।
আয়তেকিন ট্যাঙ্ক, Automate Your Busywork (পৃষ্ঠা ৫)

যদি নিজের টু-ডু লিস্টের সব আইটেমের কাজ শেষ করার বাক্সে টিক দিতে পারতেন, তাহলে খুব ভালো লাগত নিশ্চয়ই। ওরা বলে, যখন টু-ডু লিস্ট শেষ করতে পারবেন তখন মুক্ত হতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, শেষ বলে কিছু নেই।
আয়তেকিন ট্যাঙ্ক, Automate Your Busywork (পৃষ্ঠা ১৭)

অনেকে মনে করে, টু-ডু লিস্ট যত কমানো যাবে স্ট্রেসও তত কমে যাবে। কিন্তু কারো কারো জন্য অটোমেশনের আইডিয়াটাই স্ট্রেস তৈরী করে। কারণ অনেক মানুষ মনে করে যে মানুষের জায়গা দখল করে নেবে এক দল রোবট বাহিনী। কিন্তু অটোমেশন মানে মানুষকে প্রতিস্থাপিত করা নয়। বরং অটোমেশন মানে মাইন্ডলেস, সময় খাওয়া কাজগুলো মেশিনকে করতে দেওয়া যেন আমরা এমন কাজে নিজেদের ফোকাস অর্পণ করতে পারি যা মেশিন করতে পারে না।
আয়তেকিন ট্যাঙ্ক, Automate Your Busywork (পৃষ্ঠা ১০)

ব্যস্ততা দূর করার আগে আমাকে সীমানা নির্ধারণ করে নিয়ে হয়েছিল – এই কাজটা কঠিন ছিল। আমি কাজের জন্য বেরিয়ে গেলে ফোনের নোটিফিকেশন অফ রাখতাম এবং ফোন বাসায় রেখে যেতাম। আমাকে শিখতে হয়েছিল কিভাবে সচেতনভাবে মনকে কাজ থেকে দূরে রাখা যায়। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এটা সহজ হয়ে যায়। শুনতে তেমন কিছু মনে না হলেও যখন আপনি রিয়্যাকশন মোডে থাকবেন, তখন মনোযোগের সাথে, নিয়তের সাথে কোনো কাজ করা আপনার কাছে বৈপ্লবিক মনে হবে। আমি বুঝতে পেরেছি যে, আপনি যখন সীমানা নির্ধারণ করবেন তখন বুঝতে পারবেন কোন জিনিসগুলোতে আপনার বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। ইমেইল আসার সাথে সাথেই মাই ইনবক্সে ক্লিক করার আগে আপনি যে জরুরী কাজে ব্যস্ত ছিলেন সেটাতেই ডুবে থাকার সিদ্ধান্ত নেবেন আপনি।
আয়তেকিন ট্যাঙ্ক, Automate Your Busywork (পৃষ্ঠা ১৬)

কেউই আপনার ব্যস্ততাকে দূর করে দিবে না। আপনার নিজের কাজে স্পেইস তৈরী করা আপনারই দায়িত্ব। আর অটোমেশনই কেবল সেটা করতে পারে।
আয়তেকিন ট্যাঙ্ক, Automate Your Busywork (পৃষ্ঠা ২৯)

আমরা ইতিমধ্যেই টাইপসেটিং, সুইচবোর্ড অপারেশন, ডেটা এন্ট্রি, ভ্রমণ পরিকল্পনা এবং এমনকি খুচরা বিক্রয়ও কমে যেতে বা অপ্রচলিত হয়ে যেতে দেখেছি। এই পেশাগুলো অটোমেশন হচ্ছে। এভাবে প্রযুক্তি ম্যানুয়াল কাজকে প্রতিস্থাপন করতে থাকবে। যারা তাদের জীবিকা হারাচ্ছে তাদের জন্য আমাদের ন্যায়সঙ্গত পুনঃপ্রশিক্ষণের সমাধান দরকার। সেটা বিবেচনায় নিলে এটাকে ভালো পরিবর্তন বলা যায়। সারাদিন কিবোর্ড টেপা বা উইজেট পালটানোর চেয়ে গুরত্বপূর্ণ কাজ হওয়া দরকার মানুষের। আমাদের তাদের অবদান দরকার।”
আয়তেকিন ট্যাঙ্ক, Automate Your Busywork (পৃষ্ঠা ১৫৮)

যে কাজে রিপিটেশন বা পুনরাবৃত্তি আছে সেটাই হলো বিজি অয়ার্ক বা ব্যস্ততা। নিজ হাতে প্রতিটা ইমেইল কম্পজ করা আর একই ইমেইল হালকা-পাতলা পরিবর্তন করে বিভিন্ন জনের কাছে পাঠানো আপনার দক্ষতার সেরা ব্যবহার নয়। অবশ্যই এটা এমন সৃজনশীল কাজের জন্য প্রযোজ্য নয় যেখানে দক্ষতা বা কৌশল লাগে, যেমন আপনার টপ ক্লায়েন্টদের জন্য মাসিক নিউজলেটার লেখা।
আয়তেকিন ট্যাঙ্ক, Automate Your Busywork (পৃষ্ঠা ৪২)

“সৃজনশীলতা একটি সম্পূর্ণ মানব দক্ষতা যা অটোমেট করা যায় না। কিন্তু প্রযুক্তি গবেষণা বা ডেটা ট্রান্সফার বা ট্রান্সক্রিপশনের মতো প্রক্রিয়ার আরও কিছু ক্লান্তিকর অংশ দূর করতে পারে। ফলে আপনি কেবল সেই কাজগুলো করার সময় পাবেন যেগুলো একমাত্র মানুষই করতে পারে, কোনো অটোমেশন দিয়ে যা করা সম্ভব না।”
আয়তেকিন ট্যাঙ্ক, Automate Your Busywork (পৃষ্ঠা ১৫৮)

“জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার সমস্যা, রাজনৈতিক মেরুকরণ, একাকীত্ব এবং বিচ্ছিন্নতা। এগুলি হল কয়েকটি চ্যালেঞ্জ যা আমাদের একসাথে সমাধান করতে হবে—এবং এর কার্যকরী সমাধান খুঁজে পেতে স্মার্ট, সৃজনশীল, সহানুভূতিশীল ব্যক্তিদের লাগবে। আপনি ইমেইলের মতো জাগতিক কাজে যত কম সময় ব্যয় করবেন, তত বেশি সময় আপনি সৃজনশীল কাজে দিতে পারবেন।”
আয়তেকিন ট্যাঙ্ক, Automate Your Busywork (পৃষ্ঠা ১৫৮)

Leave a Comment

betvisa