“নিয়তি” শেষ পর্ব

ওখানে আমার তায়াম্মুমের মাটি রাখা ছিল। কোনো রকমে সেটা নিয়ে তায়াম্মুম করে নামাজে বসে পড়ি।

কারণ আল্লাহ্ বলেছেন, “یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اسۡتَعِیۡنُوۡا بِالصَّبۡرِ وَ الصَّلٰوۃِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ مَعَ الصّٰبِرِیۡنَ ﴿۱۵۳﴾

হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলগণের সাথে আছেন। [২:১৫৩]

মুখে কোনো দু’আ করতে পারছিলাম না। মনের মধ্যে আমার যে ঝড় বইছে তা তো আল্লাহ্ই ভাল জানেন। আমি শুধু কেঁদে কেঁদে আমার সিজদাহ্ ভেজাচ্ছিলাম।

আব্বু-আম্মুসহ সব রিলেটিভরা চলে এসেছেন। আমাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা কারো নেই। আব্বু এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করলো। তাতেও আমার কথা বের হচ্ছিলো না।

ছোটফুপি এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে যখন কাঁদতে লাগলো, তখন আচমকাই আমার মুখ থেকে কথা বের হলো। আমি ফুপিকে বললাম, “ফুপিমণি, তুমি না আমাকে বলেছিলে, “মা শা আল্লাহ্, আয়রা! তোর ভাগ্যটা কি ভালো রে! এত ভাল একজন লাইফ পার্টনার পেয়েছিস!” আমার ভাগ্যটা সত্যিই কত ভাল ফুপি, দেখেছো তুমি? আমার সন্তানকে ঘিরে যার এত উচ্ছ্বাস সে আমার সন্তানকে একবার দেখারও ফুসরত পেল না।”

ঘরভর্তি লোক সবাই ডুকরে কেঁদে উঠল। আয়ানের লাশ দেখার জন্য সবাই বলছিল বারবার। কিন্তু আমি দেখিনি, তার মৃত মুখ আমি সহ্য করতে পারতাম না। এর থেকে সে আমার স্মৃতিপটে হাসিখুশি আয়ান হয়েই থাকুক।

.
আয়ানের মৃত্যুর সাতদিন হয়ে গেল তবুও আমার চোখের পানি শুকায় না। এরই মধ্যে পেইন শুরু হলো। ডেলিভারির ডেট অনেক দেরী। বাট প্রচন্ড পেইন দেখে ড. এর কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। ড. জানালো, বাচ্চার পজিশন এন্ড রোগীর কন্ডিশন দু’টোই খুব খারাপ। দ্রুত হসপিটালে এডমিট করান। এখনই অপারেশন করাতে হবে। লেইট হলে কাউকেই বাঁচানো যাবে না।

এরপর হসপিটালে এডমিট হয়ে আমার অপারেশন হয়। জ্ঞান ফিরতে অনেক সময় লাগে। আম্মু টাওয়ালে জড়িয়ে আমার বাচ্চাটাকে আমার সামনে নিয়ে আসে। এ যেন আয়ানেরই কপি! কি মিষ্টি দেখতে! আমি তাকে কোলে নিয়ে একটু ছুঁয়ে দেখতেই আমার হৃৎপিণ্ড যেন থেমে গেল। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আম্মু, বাবুর শরীর এত ঠান্ডা কেন?”

মা আর কান্না চেপে রাখতে পারলেন না। বললেন, “বাবু তার বাবার কাছে চলে গেছে, মা। তোর বাবা তোকে জানানোর আগেই দাফনকাজ সম্পন্ন করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি দেইনি, তোর জ্ঞান ফেরার অপেক্ষায় ছিলাম।”

আমার চোখের নোনাজল টুপটুপ করে আমার পিচ্চি মামণির মুখে পড়তে লাগলো।

আমি দু’হাত উপরে তুলে আল্লাহকে বললাম,
“হে আল্লাহ্! আমাকে আরও ধৈর্য দান করুন। আমি আপনার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে চাই। আমাকে সিরাতুল মুস্তাকিমের পথ দেখান। ইয়া রহমান, আমাকে পথভ্রষ্ট করবেন না।”

নিথর বাচ্চা মেয়েটির দিকে চেয়ে বললাম, “আমার দিকে একটিবারও চোখ মেলে তাকালি না, মা? তুইও আমাকে একা করে তোর বাবার সঙ্গী হলি? আমি তো একা রয়ে গেলাম! আমার জন্য আল্লাহর কাছে জান্নাতের আর্জি জানাস।”

এরপর আমার কলিজার টুকরোটাকে বুকে চেপে ধরে কিছুক্ষণ রেখে, তার হিম শীতল তুলতুলে নরম শরীরটা পরম আদরে ছুঁয়ে দিলাম। চোখ মুখ মুছে আম্মুর দিকে তাকিয়ে বললাম, “নিয়ে যাও মা, ওর বাবার পাশেই ওকে শুয়ে দিও।”
আম্মু চলে গেলে আমি হসপিটালের জানালা দিয়ে আকাশ দেখতে লাগলাম। ভাবনারা জানান দিল, আমার নিয়তি এভাবেই লেখা ছিল!

Writer: Mahazabin Sharmin Priya

Leave a Comment