নারীদের আন্তঃব্যক্তিক আচরণ, হিজাব ও ইসলামে প্রাইভেসির ধারণা

ইসলামে নারী-পুরুষ সমান হলেও তারা ভিন্ন। কারণ, মানসিকতার দিক দিয়ে উভয় লিঙ্গের সাইকোলজি, আবেগ ও দৃষ্টিভঙ্গি সবই আলাদা। ফিতনার সামান্য আশঙ্কা থাকলেও ইসলাম সে জায়গায় ফ্রিমিক্সিং নিষিদ্ধ করে। মনোবিদরা দেখিয়েছেন, মিশ্র-লৈঙ্গিক পরিবেশে পুরুষেরা নারী-পুরুষের মেলামেশাকে অধিক যৌনতাপূর্ণ হিসেবে দেখে। নারীদের কাছ থেকে বন্ধুত্বের ক্ষুদ্রতম ইঙ্গিতকেও পুরুষেরা যৌনমিলনের আহ্বান হিসেবে দেখে। কুরআন এ সমস্যার সমাধান হিসেবে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ করেছে। তা ছাড়া বেগানা নারী-পুরুষের কোনো প্রয়োজনে কথা বলতে হলে কুরআন নারীদের পুরুষের সঙ্গে সরাসরি ও সোজাসাপটা কথা বলার নির্দেশ দিয়েছে, যেন পুরুষেরা একে যৌনতার আহ্বান মনে না করে।

মনোবিজ্ঞানীরা পুরুষের মানসিকতার এই দিকটি গবেষণা করে দেখেছেন যে, এ ধরনের আচরণ কর্মক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ও স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে (Kansas State University) ফ্র্যাঙ্ক ই. সাল (Frank E. Sal) ও তাঁর সহযোগীদের দ্বারা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারী-পুরুষের মেলামেশাকে পুরুষেরা নারীদের চেয়ে অধিক যৌনতাপূর্ণ হিসেবে দেখে এবং চিন্তা করে। এই গবেষণায় নারী-পুরুষের মেলামেশার তিনটি ভিন্ন ভিন্ন চিত্রপট ধারণ করা হয়, পুরুষেরা যেগুলোকে নারীদের চেয়ে অধিক যৌনভাবে দেখেন। যেমন :

১. অপরিচিত নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতিমূলক আলাপ হচ্ছে।

২. এক পুরুষ ম্যানেজার একজন নারী ক্যাশিয়ারকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

৩. একজন পুরুষ অধ্যাপক একজন ছাত্রীর সঙ্গে তার প্রজেক্টের সময় বাড়ানো নিয়ে আলোচনা করছেন।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, পুরুষেরা ভেবেছিল যে, নারী অভিনেত্রীরা পুরুষের কাছে নিজেকে যৌন-আবেদনময়ী হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে, ফ্লার্ট করছে কিন্তু নারী পর্যবেক্ষকরা ঘটনা তিনটিকে এভাবে দেখেননি। তাই পুরুষের ক্ষেত্রে নারীদের আচরণ ও উদ্দেশ্যকে ভুল বোঝার আশঙ্কা নারীদের চেয়ে অনেক বেশি।

মনোবিজ্ঞানী ক্যাথরিন বি. জনসন (Katherine B. Johnson), মার্গারেট এস. স্টকডেল (Margaret S. Stockdale) ও ফ্রাঙ্ক ই. সাল আরেকটি ল্যাব এক্সপেরিমেন্ট করেন, যাতে 187 জন মহিলা এবং 165 জন পুরুষ স্নাতক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। আগের পরীক্ষায় প্রথাগতভাবে পুরুষ ছিল কর্তৃত্বের অংশে এবং নারী তার অধীন। যেমন, পুরুষ ম্যানেজারের অধীনে নারী ক্যাশিয়ার বা পুরুষ অধ্যাপকের অধীনে তার ছাত্রী; কিন্তু এবার নারী-পুরুষের ভূমিকা পুরোপুরি উলটে দেওয়া হয়। গবেষণার সাবজেক্টদের একটি পাঁচ মিনিটের ভিডিয়ো ক্লিপ দেখানো হয়। মনোবিজ্ঞানীরা ১২টি ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যকল্প তৈরি করেন, যেখানে একজন অধ্যাপক বিপরীত লিঙ্গের শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথাবার্তা বলবেন বা মেলামেশা করবেন। তবে প্রতিটি দৃশ্যকল্পে পাওয়ার হোল্ডারের লিঙ্গ, হয়রানির মাত্রা এবং হয়রানির প্রতি প্রতিক্রিয়ার মাত্রা পরিবর্তন করা হতে থাকে। নারীর অবস্থান বা মর্যাদা নির্বিশেষে পুরুষ যে নারীদের আহ্বানের ব্যাপারে ভুল বোঝে, এ গবেষণায় সেটাই আগের গবেষণার মতো আবারও প্রমাণিত হয়।

তারা উল্লেখ করেন, ‘সংক্ষেপে বললে পুরুষেরা যে নারীদের আচরণের ব্যাপারে ভুল ধারণা করে, সেই আইডিয়াকে এ গবেষণা আরও জোরালো করেছে। নারীর ব্যাপারে পুরুষের এই ভুল ধারণা কেবল নারীটি তার অধীন থাকলেই যে ঘটে তা নয়; বরং নারী পদমর্যাদায় পুরুষের চেয়ে উঁচুতে থাকলেও ঘটে। এ ছাড়া হয়রানির পরিমাণ বাড়তে থাকলেও নারীর আচরণের ব্যাপারে পুরুষের ভুল ধারণা অব্যাহত থাকে, তবে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, প্রফেসরের প্রস্তাব ছাত্রী গ্রহণ করছে নাকি নাকচ করছে, তার ওপর পুরুষের ভুল ধারণা নির্ভর করে না; বরং এরপরও এটি অব্যাহত থাকে।’

মিশ্র-লৈঙ্গিক পরিবেশে যেমন সহশিক্ষামূলক স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও অন্যান্য সামাজিক মেলামেশার জায়গায় পুরুষেরা সাধারণত নারীদের আচরণ সঠিকভাবে ধরতে পারে না, ভিন্ন অর্থ করে। এরপর সেই ভুল ধারণার ভিত্তিতে সে প্রতিক্রিয়া জানায়; কিন্তু কথাবার্তা আরও এগোনোর পর একপর্যায়ে নিজের ভুল বুঝতে পারে। এটাও বোঝে যে, তার প্রতি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না ওই নারীর। একইভাবে ফ্রিমিক্সিংয়ের পরিবেশে অনেক নারী দেখেছেন যে, পুরুষের প্রতি তাদের আগ্রহ ও বন্ধুত্বের বহিঃপ্রকাশকে অনেক পুরুষ তার প্রতি যৌন-আগ্রহ বা প্রেমের আহ্বান হিসেবে দেখেছে।

উপরোল্লিখিত গবেষণায় দেখানো হয়েছে, নারীরা পুরুষের প্রতি তাদের অনুভূতিকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিলেও পুরুষেরা তাদের ভুল ধারণা, মিথ্যা ও কল্পনার জগত থেকে বেরোতে চায়নি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামে হিজাবের নির্দেশনার কারণ সহজে বোঝা যায়। সমাজে ফ্রিমিক্সিংয়ের বিস্তারে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেয়েরাই। এ কারণে ইসলাম অঙ্কুরেই মন্দকে বিনষ্ট করে দেয়। নারীদের প্রতি পুরুষের সত্তাগত দুর্বলতার ব্যাপারে ইসলাম অবগত। এ জন্য ইসলাম মাহরাম নারীর সঙ্গে পুরুষের গায়রে মেলামেশার কোনো সুযোগই দিতে চায় না। কারণ, এতে সতীসাধ্বী নারীদের ব্যাপারে পুরুষেরা ভুল ধারণা করবে।

ইসলামি সমাজের সামাজিক গঠনে প্রত্যেক ব্যক্তির প্রাইভেসিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি আরবি শব্দ ‘হায়া’র অনুবাদ হচ্ছে ‘গোপন জিনিসকে গোপন রাখা’। ব্যক্তিগত ও উন্মুক্ত জায়গায় পর্দা টেনে দিয়ে (যেমন হিজাব) ইসলাম উভয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রেখেছে। ব্যক্তিগত জায়গা থাকবে বাইরের জগত থেকে একদম বিচ্ছিন্ন, যেকোনো অনুপ্রবেশ থেকে নিরাপদ। মানুষ নির্জনে যা করে, সেটাকেও সুরক্ষা দিয়ে আড়ালে রাখা হয়েছে। এ জন্য ইসলামে অতিরিক্ত ধারণা করা, গালগল্প বা গুপ্তচরবৃত্তির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। ফলে গোপন জিনিসকে গোপনই রাখতে হবে। তাই কেবল দেয়ালের মতো বাহ্যিক পর্দা নয়; বরং মুসলিমদের অন্যের গোপনীয়তার ব্যাপারে কথা বলা ও কুধারণা করা নিষিদ্ধ। কারও দেহের ব্যাপারেও একই বিষয় খাটবে, যা দেখানো নিষেধ তা ঢেকে রাখতে হবে। আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন,

﴿وَ قُلۡ لِّلۡمُؤۡمِنٰتِ یَغۡضُضۡنَ مِنۡ اَبۡصَارِهِنَّ وَ یَحۡفَظۡنَ فُرُوۡجَهُنَّ وَ لَا یُبۡدِیۡنَ زِیۡنَتَهُنَّ اِلَّا مَا ظَهَرَ مِنۡهَا﴾

আর মুমিন নারীদের বলুন, যেন তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায়, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ না করে। [সুরা নুর : ৩১]

তা ছাড়া ঘর ও পরিবারের একান্ত স্থানে শালীন পোশাকের ইসলামি নিয়মকানুন কিছুটা শিথিল। পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে মিশতে পারেন। ঠিক তেমনই পোশাকের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ সহজ। গায়রে মাহরামের সামনে নারীকে যতটা পর্দা করতে হয়, মাহরামের সঙ্গে ততটা করতে হয় না; কিন্তু ঘরের বাইরে এই নিয়মগুলো বেশ কঠোর। নিয়মগুলো কেবল শালীন পোশাকে সীমাবদ্ধ নয়, আচরণও এর অন্তর্ভুক্ত। যথাসম্ভব পুরুষের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলতে হবে, বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে কথা বলার সময় নারী-পুরুষ কেউই প্রলোভনমূলক কথা বলবে না। নারীরা তাদের কণ্ঠস্বর নরম করবে না। নারী-পুরুষের নির্জনতা একদমই কাম্য নয়। তাই এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ, বেগানা নারী-পুরুষ একান্ত হলে তৃতীয়জন হয় শয়তান। মুসলিমের পোশাক, কথাবার্তা ও আচরণে এমন একটি পর্দা থাকতে হবে, যা পাবলিক জায়গা এবং ব্যক্তিগত জায়গা আলাদা করে। এখান থেকে স্পষ্ট যে হিজাব ও নিকাব ‘গোপনীয়তার এক পর্দা’ এবং লজ্জাশীল নারীদের প্রতীক। ইসলাম অন্যের গোপনীয়তাকে যেমন রক্ষা করতে বলে, তেমনই সম্মানজনক শালীন পোশাক পরিধানের দ্বারা নিজেদের গোপনীয়তাকেও রক্ষার নির্দেশ দেয়। আর এর সর্বোত্তম বহিঃপ্রকাশ ঘটে হিজাব ও নিকাবে।

নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও নিকাব গোপনীয়তা ও সামাজিক দূরত্বের প্রতীক। আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী রবার্ট এফ. মারফি (Robert F. Murphy) আফ্রিকার সাহারার তুয়ারেগদের (Tuareg) নিয়ে American Anthropologist-এ প্রকাশিত গবেষণায় তিনি উল্লেখ করেছেন, চেহারার পর্দা সামাজিক দূরত্বের পাশাপাশি একটি সমাজে সামাজিক প্রতিপত্তি ও মর্যাদার প্রতীক। উপরন্তু পর্দার সঙ্গে গোপনীয়তাও সম্পর্কিত।

[ড. গওহার মুশতাকের Hijab: Liberation or Oppression অবলম্বনে]

Leave a Comment