দাম্পত্য জীবনে গায়রত

“আজকাল সাদ কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। সব সময় বিরক্তিভাব নিয়ে থাকে। কিছু বললেই রেগে যায়। আগে কত কেয়ার করত, কিছুদিন পর পরই ঘুরতে নিয়ে যেত, এই ব্যালকনিতে বসে দুজনে কত সময় কাটিয়েছি। গল্প করতাম, চা খেতাম, ভবিষ্যত পরিকল্পনা করতাম। কিন্তু এখন সবই যেন দুঃস্বপ্ন। হাহ! এখন আমাকে সময় দেবার মত সময়ই যেন তার নেই। কতদিন একসাথে বসে চা খাওয়া হয় না! কতদিন এক সাথে বসে নিজেদের নিয়ে গল্প করা হয় না।’

‘আমার দ্বীনে ফেরার আগ পর্যন্ত তো সবই ঠিক ছিল। কিন্তু যেই না আমি দ্বীনে ফিরলাম, ওয়েস্টার্ন ড্রেস পরা বাদ দিয়ে আপাদমস্তক কালো বোরখায় নিজেকে জড়ালাম, গায়রে মাহরাম মেনে চলতে শুরু করলাম, তখনই বাধলো বিপত্তি।’

এসব ভাবতে ভাবতে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে চায়ের কাপে চুমুক দিল মিম। ব্যালকনি থেকে উঁকি দিয়ে দেখলো বাচ্চারা ঘুমিয়ে গেছে। চা শেষ করে ক্লান্ত পায়ে উঠে দাঁড়ালো। ঝুলন্ত মানিপ্ল্যান্টের পাতায় হাত বুলিয়ে সে মুচকি হেসে নিজেকে বললো, “যার গায়রতবোধ নেই, তার তো পুরুষত্বই নেই। আর তাকে নিয়ে এতকিছু ভেবে কি লাভ? সে তো পরিবর্তন হবার মতো ছেলে নয়। এখন শুধু দুআই একমাত্র সম্বল।”

উপরে উল্লেখিত ঘটনাটি কাল্পনিক। তবে বর্তমান সমাজে প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবারেই এমনটি হচ্ছে। অনেক দ্বীনদার বোন সাফার করছে। আবার অনেক বেদ্বীন বোন এমন আছে যে, তারা তাদের স্বামীর এই নোংরা কর্মকাণ্ড উপভোগ করছে এবং নিজেরাও তাদের শারীরিক সৌন্দর্য বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে পরপুরুষকে দেখিয়ে মজা নিচ্ছে।

শুধু বেদ্বীনরাই নয়, তথাকথিত দ্বীনদার ভাইয়েরা পাঞ্জাবি পরে তাদের আপাদমস্তক ঢাকা আহলিয়ার সাথে রিক্সায়, রেস্টুরেন্টে বসে ছবি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করছেন। আপনাদের কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, বেদ্বীনদের না হয় আত্মমর্যাদাবোধ নাই কিন্তু আপনারা তো দ্বীনদার। আপনাদের গায়রতবোধ কোথায় গেল?

পুরুষত্ব মানে কি শুধুই বাচ্চা জন্মদানের ক্ষমতা? আপনি আপনার স্ত্রীকে গায়রে মাহরামের সামনে যেতে বাধ্য করছেন। তাতেও ক্ষ্যান্ত হোননি। নিজেদের ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিতে আপনার একটুও আত্মমর্যাদায় লাগছে না। বরং আপনার স্ত্রীকে নিয়ে হাজারো পুরুষের রসালো মন্তব্য আপনাকে খুশি করছে। ছিঃ! এই মানসিকতা নিয়ে আপনি কীভাবে নিজেকে পুরুষ দাবি করেন?শুধু তাই নয়, আপনি এমন একজন গায়রতহীন পুরুষ, আপনি এমন একজন গায়রতহীন নারী যার ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টে থাকে গায়রে মাহরাম। এক গায়রে মাহরাম অন্য গায়রে মাহরামের পোস্টে কমেন্ট করেন, কমেন্টের রিপ্লাইয়ে প্রকাশ্যে চলে কত শত হাস্যরসিকতা। বিশ্বাস করুন, আপনাদের হায়া কমে যেতে পারে। গায়রতবোধ লোপ পেতে পারে। কিন্তু আপনাদের এমন বেহায়াপনা দেখে আপনাদের অন্য গায়রতসম্পন্ন ভাইবোনের কষ্ট লাগে।

আমার ভাইয়েরা,
আপনারা কি জানেন না, মাহরাম আত্মীয় ছাড়া অন্য কারো জন্য নারীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার অনুমতি দেয়নি।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমরা নারীদের সঙ্গে নির্জনে সময় কাটানো থেকে বিরত থাকো। কেউ প্রশ্ন করলো দেবরের সঙ্গেও? রাসূল (সা.) বলেন, সে নারীর জন্য মৃত্যুর সমতুল্য।’ (সহিহ বুখারি, নিকাহ অধ্যায়, হাদিস: ৪৮৩১)।

উকবা ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে মারফু‘ হিসেবে বর্ণিত,
“তোমরা স্ত্রীলোকদের কাছে প্রবেশ করা থেকে দূরে থাক। এক আনসারী ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! দেবর সম্পর্কে আপনার অভিমত কী? তিনি বললেন, দেবর তো মৃত্যু সমতুল্য।”

সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় আবূ তাহির থেকে, তিনি ইবন ওহাব রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি লাইস ইবন সা‘দ রাহিমাহুল্লাহকে বর্ণনা করতে শুনেছি, ‘দেবর বলতে স্বামীর ভাই এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন যেমন, চাচাতো ভাই ইত্যাদি বুঝায়।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরনারীদের কাছে যাওয়া এবং তাদের সাথে নির্জনে অবস্থান করা থেকে সতর্ক করেছেন। কেননা একজন পুরুষ কোনো নারীর সাথে নির্জনে থাকলে তাদের তৃতীয়জন থাকে শয়তান। তাছাড়া মানুষের অন্তরসমূহ অত্যন্ত দুর্বল আর গুনাহের প্রতি আকর্ষণ খুব শক্তিশালী। ফলে হারাম সংঘটিত হয়ে যায়। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিতনায় পতিত হওয়া ও ফিতনার কারণসমূহ থেকে দূরে থাকতে পরনারীর সাথে নির্জনে অবস্থান করতে নিষেধ করেছেন। তখন এক আনসারী সাহাবী জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! দেবর সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করুন, যিনি স্বামীর ভাই ও ঘনিষ্ট আত্মীয়। কখনো তাকে তার ভাইয়ের কাছে যেতে হয় সেখানে তার স্ত্রী আছে। এমতাবস্থায় তার জন্যে কি অনুমতি আছে? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “দেবর তো মৃত্যু সমতুল্য।” কেননা মানুষ সাধারণত শিথিলতা দেখিয়ে সেখানে প্রবেশ করে এবং এর প্রতিবাদ করে না। ফলে পরনারীর সাথে একাকী হয়। কখনো অশ্লীলতা সংঘটিত হয় এবং অজান্তে ও সন্দেহাতীতভাবে অশ্লীল কাজ দীর্ঘ দিন পর্যন্ত চলতে থাকে। ফলে দীন ধ্বংস হয় ও চিরস্থায়ী ক্ষতি সাধিত হয়। সুতরাং তার জন্য ভাইয়ের স্ত্রীর কাছে প্রবেশের অনুমতি নেই। বরং তোমরা তার ব্যাপারে সতর্ক থাকো ও তোমাদের স্ত্রীদের সাথে তার নির্জনে দেখা করার ব্যাপারে সাবধান থাকো। যদি তোমরা আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন হয়ে থাকো।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কোনো কোনো সময় মুমিনের আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে। আর কখনো কখনো আল্লাহ তায়ালার আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে। আল্লাহ তায়ালার আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে যখন মানুষ আল্লাহর নিষিদ্ধ হারাম কাজে লিপ্ত হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ২৭৬১)।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালার চেয়ে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন কেউ নেই। এজন্য তিনি প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন। আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজের প্রশংসার চেয়ে প্রিয় কোনো বস্তু নেই। তাই তিনি নিজে নিজের প্রশংসা করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৪৬৩৪)।

আমার বোনেরা,

আপনারা কি জানেন না, পবিত্র জীবন যাপনের জন্য আল্লাহ তায়ালা কী নির্দেশ দিয়েছেন? আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নারীরা যেন নিজেদের সৌন্দর্যকে প্রকাশ না করে।’ (সূরা: নূর, আয়াত: ৩০)।

আপনারা তো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতো একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন নবির উম্মত। হযরত আলি (রাদিয়াল্লাহু আনহু), হযরত ওমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু), হজরত সাদ ইবনে উবাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর মতো সাহাবিদের উত্তরসূরি। তবুও আপনাদের এই হালত কেন? আপনারা কি জানেন না, তাদের গায়রতবোধ কেমন ছিল? আপনাকে রিমাইন্ডার দেবার জন্য একটি হাদিস উল্লেখ করছি।
হযরত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কেরামের সামনে ব্যভিচারের শাস্তির জন্য সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয়টি আলোচনা করেন। হযরত সাদ ইবনে উবাদা রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন বলেন, কাউকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচারে পেলে আমি সাক্ষী খুঁজতে যাবো! বরং আমি তাকে তলোয়ারের ধারালো অংশ দিয়ে আঘাত করবো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা সাদের আত্মসম্মানবোধ দেখে আশ্চর্য হচ্ছো? আল্লাহর কসম, আমি তার চেয়ে বেশি আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন এবং আল্লাহ তায়ালা আমার চেয়ে বেশি।’ (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল লিয়ান, হাদিস নম্বর: ৬৩৪০)।

দেখুন, তাঁদের গায়রত কেমন ছিল। আর বর্তমানে আমরা কোন হালতে আছি। আমরা হচ্ছি নফসের পুজারি। আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করে শয়তানের দাসত্ব করছি। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ না করে পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছি। ফলে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও দাম্পত্য জীবনে সুখ অধরাই থেকে যাচ্ছে। প্রতিনিয়ত দাম্পত্য কলহ সৃষ্টি হচ্ছে, স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরছে, বেড়ে যাচ্ছে ডিভোর্সের হার। সুতরাং আপনিই বেছে নিন, কোনটি আপনার জন্য কল্ল্যাণকর। একটু সময় নিয়ে ভাবুন। আমাদের হাতে সময় তো সীমিত। যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যু এসে উপস্থিত হতে পারে। তখন চাইলেও আর কিছু করার সু্যোগ থাকবে না।

Leave a Comment