জিলহজের প্রথম ১০ দিনের ফজিলত ও আমল

আরবি ক্যালেন্ডারে সব দিনের মর্যাদা সমান নয়। বরং আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা কিছু দিনকে অন্যান্য দিনের তুলনায় মর্যাদার দিক দিয়ে এগিয়ে রেখেছেন। কিছু দিনে অধিক বারাকাহ রেখেছেন। এটা মহান আল্লাহর মহান প্রজ্ঞা ও রহমতের নিদর্শন। কারণ সব দিন একই হলে আমরা নির্দিষ্ট কিছু দিনে অধিক ইবাদত করতে আগ্রহী হতাম না। বরং, সারা বছর ধরে আমরা একই রকম এনার্জি ধরে রাখতাম। অতএব, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা এই বরকতময় দিনগুলিতে আমাদের নিজেদের আরো পরিশুদ্ধ করার এবং আমাদের নেক আমলগুলো বৃদ্ধি করার সুযোগ দিচ্ছেন।
রমজানের সুপরিচিত শেষ দশ রাত ছাড়াও বছরের একটি বরকতময় সময় হল জিলহজের প্রথম দশ দিন। এটি এমন এক সময় যা অনেকেই উপেক্ষা করেন।
ইবনু আব্বাস রা. বলেন, وَاذْكُرُوا اللَّهَ فِي أَيَّامٍ مَعْدُودَاتٍ (সুরা বাকারাহ ২/২০৩) দ্বারা (জিলহজ্জ মাসের) ১০ দিন বুঝায় এবং مَعْدُودَاتٍ দ্বারা ‘আইয়ামুত তাশরীক’ বুঝায়। ইবনু উমার ও আবু হুরাইরা (রা.) এই ১০ দিন তাকবির বলতে বলতে বাজারের দিকে যেতেন এবং তাদের তাকবিরের সঙ্গে অন্যরাও তাকবির বলত।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে জিলহজ মাসের প্রথম ১০ রাতের কসম খেয়েছেন।

وَٱلْفَجْرِ. وَلَيَالٍ عَشْرٍ
‘শপথ ফজর-কালের এবং ১০ রাতের’। [সুরা ফাজর : ১-২]

কিছু আলিমের মতে, এখানে জিলহজের ১০ রাতের কথা বলা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ কোনো জায়গায় শপথ নিলে বা কসম খেলে সেটা অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচিত হয়। এমন জায়গায় মনোযোগ দেওয়া এবং কসমের বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবনাচিন্তা করা অত্যন্ত জরুরী।

জিলহজ মাসের ফজিলত

এই দশ দিনের একটি ফজিলত হল যে এই দিনগুলিতে করা নেক কাজগুলোর সাওয়াব বছরের অন্য যে কোনো দিনে করা নেক আমলের চেয়ে আলাদা এবং অনেক বেশী। এর প্রমাণ একটি হাদিসে পাওয়া যায়। ইবনু আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَنَّهُ قَالَ مَا الْعَمَلُ فِي أَيَّامٍ أَفْضَلَ مِنْهَا فِي هَذِهِ قَالُوا وَلاَ الْجِهَادُ قَالَ وَلاَ الْجِهَادُ إِلاَّ رَجُلٌ خَرَجَ يُخَاطِرُ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ بِشَيْءٍ
জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমলের চেয়ে অন্য কোন দিনের আমলই উত্তম নয়। তাঁরা জিজ্ঞেস করলেন, জিহাদও কি (উত্তম) নয়? নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ জিহাদও নয়। তবে সে ব্যক্তির কথা ছাড়া যে নিজের জান ও মালের ঝুঁকি নিয়েও জিহাদে যায় এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসে না। [সহিহ বুখারি : ৯৬৯]

এ সময় আল্লাহ নেক কাজের পুরস্কার বহুগুণ করে দেন এবং প্রচুর সাওয়াব দান করেন। তাই, নিজেদের দায়িত্ব পালন, গুনাহ এড়িয়ে চলা এবং সুন্নাত আমল বৃদ্ধি করার জন্য জিলহজের শেষ ১০ দিন উপযুক্ত সময়।
জিলহজ মাসের আরেকটি ফজিলত হল যে, ইসলাম ধর্ম পরিপূর্ণ হয়েছিল বরকতময় জিলহজ মাসে, বিশেষ করে আরাফাহর দিনে, যা জিলহজ মাসের নবম দিন। তারিক ইবনু শিহাব রাহ. থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, এক ইয়াহুদি উমর রা. কে বলল,

يا أمِيرَ المُؤْمِنِينَ، آيَةٌ في كِتَابِكُمْ تَقْرَؤُونَهَا، لو عَلَيْنَا مَعْشَرَ اليَهُودِ نَزَلَتْ، لَاتَّخَذْنَا ذلكَ اليومَ عِيدًا. قالَ: أيُّ آيَةٍ؟ قالَ: “اليومَ أكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وأَتْمَمْتُ علَيْكُم نِعْمَتي ورَضِيتُ لَكُمُ الإسْلَامَ دِينًا” (المائدة: 3) قالَ عُمَرُ: قدْ عَرَفْنَا ذلكَ اليَومَ، والمَكانَ الذي نَزَلَتْ فيه علَى النبيِّ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ، وهو قَائِمٌ بعَرَفَةَ يَومَ جُمُعَةٍ
হে আমীরুল মুমিনীন! আমাদের উপর যদি এই আয়াত “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সস্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম” (৫ঃ ৩) অবতীর্ণ হত, তাহলে সে দিনটিকে আমরা ঈদ (উৎসবের) দিন হিসাবে গণ্য করতাম।
উমর (রাঃ) বললেন, আমি অবশ্যই জানি এ আয়াতটি কোন দিন অবতীর্ণ হয়েছিল। আরাফার দিন জুমুআ দিবসে এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয়েছিল। [সহিহ বুখারি : ৬৭৭২]

জিলহজের শেষ ১০ দিনের আমল

১. যে ব্যক্তির হজ করার আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা আছে তিনি হজ পালনে কোনো ওজর দেখাতে পারবেন না। বরং হজ করা তার ওপর ওয়াজিব হবে।
২. যেদিন জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাবে সেদিন থেকে শুরু করে কুরবানি করার আগ পর্যন্ত নখ, চুল ও গোঁফ কাঁটা যাবে না।
উম্মু সালামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ كَانَ لَهُ ذِبْحٌ يَذْبَحُهُ فَإِذَا أَهَلَّ هِلاَلُ ذِي الْحِجَّةِ فَلاَ يَأْخُذَنَّ مِنْ شَعْرِهِ وَلاَ مِنْ أَظْفَارِهِ شَيْئًا حَتَّى يُضَحِّيَ
যার কাছে কুরবানীর পশু থাকবে এবং সে তাকে কুরবানী করতে চায়, তার উচিত হবে জিলহজের চাঁদ দেখার পর হতে কুরবানী করার আগ পর্যন্ত তার চুল ও নখ না কাটা। [সুনানু আবু দাউদ: ২৭৮২]
৩. আরাফার দিনের রোজার কারণেও এই শেষ দশক অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ। এটি বছরের অন্যতম গুরত্বপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। এই দিনের ফজিলতের ব্যাপারে হাদিস গ্রন্থে বিভিন্ন হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
৪. নিজের নিয়ত পরিশুদ্ধ করুন
বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার দরুণ হয়তো এই ১০ দিনও আপনার নানা ব্যস্ততায় কাটতে পারে। তবুও নিয়ত রাখুন যে আপনি দিনের কিছুটা সময় নিজেকে ইবাদতে নিমগ্ন রাখবেন। অন্যান্য দুনিয়াবি কাজের ক্ষেত্রেও নিজের নিয়ত পরিশুদ্ধ করে নিন। দুনিয়াবি কাজও যদি নেক নিয়তে করে থাকেন তাহলে সেটা ইবাদত হিসেবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে ইনশাআল্লাহ।
৫. প্রচুর জিকির করুন
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জিলহজের ১০ দিনে প্রচুর পরিমাণে তাহলিল, তাকবীর ও তাহমীদ পাঠ করো।”
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, আলহামদুলিল্লাহ
এই তিনটি বাক্য আপনার ঠোঁটে ঠোঁটে রাখুন সারাদিন!
৬. সারাদিন সিয়াম পালন করুন এবং রাতে নফল ইবাদত করুন
জিলহজের ১০ দিনের একটি বিশেষ আমল হচ্ছে, দিনের বেলা সাওমরত থাকা এবং রাতের বেলা নফল ইবাদতে জাগ্রত থাকা।
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
مِنْ أَيَّامِ الدُّنْيَا أَيَّامٌ أَحَبُّ إِلَى اللهِ سُبْحَانَهُ أَنْ يُتَعَبَّدَ لَهُ فِيهَا مِنْ أَيَّامِ الْعَشْرِ وَإِنَّ صِيَامَ يَوْمٍ فِيهَا لَيَعْدِلُ صِيَامَ سَنَةٍ وَلَيْلَةٍ فِيهَا بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ
জিলহজের দশ দিনের ইবাদতের চেয়ে দুনিয়ার অন্য কোন দিনের ইবাদত মহান আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় নয়। এই ক’দিনের মধ্যকার এক এক দিনের রোজা এক বছর রোজা রাখার সমান এবং তার এক একটি রাত কদরের রাতের সমান। [সুনানু ইবনু মাজাহ : ১৭২৮]
হুনায়দা ইবন খালিদ তাঁর স্ত্রী হতে এবং তিনি নবি করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কোন এক স্ত্রী হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহজের প্রথম নয়দিন ও আশুরার দিন রোজা রাখতেন। আর তিনি প্রতি মাসে তিনদিন, মাসের প্রথম সোম ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখতেন। [সুনানু আবু দাউদঃ ২৪২৯]
৭. জিলহজ মাসের নবম দিন ও রাত আল্লাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহ। এই দিনে হাজিগণ আরাফাতের ময়দানে সমবেত হন। আর রাতে মুজদালিফায় অবস্থান করেন। নবম জিলহজে সাওম পালনে অত্যন্ত উৎসাহিত করা হয়েছে। কারণ এই দিনের রোজা পালনকারীর বিগত এক বছর ও আগামী এক বছরের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন আল্লাহর কাছে কতটা গুরত্ব বহন করে তা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছি। তাই এই দশদিন আময়রা নিজেদের ডুবিয়ে রাখব জিকির-আজকারে, কুরআন তিলাওয়াতে, নফল ও সুন্নাহ ইবাদতে, তাওবা-ইস্তিগফারে। আল্লাহ আমাদের আমলের তাওফিক দিন। আমিন।

Leave a Comment