কটু আচরণে স্ত্রীর প্রতি ধৈর্যধারণ

এমন স্ত্রীর প্রতি আপনার আচরণ কেমন হবে যিনি আপনি বাসায় ঢোকামাত্রই আপনাকে নেতিবাচক কিছু বলে, আপনার সাথে অপ্রীতিকর আচরণ করতে শুরু করে? আপনাকে বাজে কথা শোনায়, আপনাকে অপদস্থ করে। অনেকেই হয়তো উত্তর দেবেন যে, “আমি ওই মহিলাকে তালাক দিয়ে দেব।” কিন্তু এই উত্তর অনুসারে চললে ডিভোর্সের সংখ্যা আকাশচুম্বী হয়ে যাবে। এই সংক্ষিপ্ত লেখায় আমি আলোচনা করতে চায় এই বিষয়ে যেখানে আমি সালাফদের কিছু ঘটনা তুলে ধরব যে তারা তাদের কটু আচরণকারী স্ত্রীদের সাথে কেমন আচরণ করেছেন। এতে নিশ্চয়ই আমাদের জন্য শেখার বিষয় আছে।

আল্লাহ বলেন,

তাদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করবে না, যদি না তারা সুস্পষ্ট ব্যভিচার করে। [সুরা নিসাঃ ১৯]

আল্লাহ বলেন,

আর তোমরা তাদের সাথে সদ্ভাবে বসবাস কর। [সুরা নিসাঃ ১৯]

আল্লাহ বলেন,

আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন। [সুরা নিসাঃ ১৯]

এ আয়াতে মহান আল্লাহ আমাদেরকে স্ত্রীদের সাথে দয়ালু আচরণ করতে বলেছেন, তাদের সাথে তাকওয়ার সাথে ও দীনদারিতার সাথে বসবাস করতে বলেছেন। তাদের মধ্যে যদি আমরা অপছন্দনীয় কিছু দেখি তাহলে আমাদের স্মরণ রাখা উচিত যে, হয়তো তাদের দাম্পত্যসঙ্গ থেকে আমি এমন কিছু লাভ করব যা আমার জীবনে ব্যাপক বারাকাহ এনে দেবে। তার ভেতর একটা অকল্যাণ থাকলে দশটা কল্যাণ থাকতে পারে।

আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন,

“মুমিন ব্যক্তির উচিত নয় তাদের মুমিনা স্ত্রীকে ঘৃণা করা। কারণ সে যদি তার একটি বৈশিষ্ট্যকে ঘৃণা করে তাহলে সে তার অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য নিয়ে অবশ্যই সন্তুষ্ট থাকবে।”

প্রায়ই যেসব লোক দেখে যে তার স্ত্রী তার সাথে বাজে আচরণ করছে, তখন সে তার নিজের স্ত্রীর ব্যাপারে তার পিতামাতার কাছে অভিযোগ করে। তারা তাকে বলে দেয় যে তার স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিতে। দুঃখজনক বিষয় মনে হচ্ছে, অনেক ভাই মনে করে এ ক্ষেত্রে পিতামাতার কথা শোনা হচ্ছে তাদের আনুগত্য করা আর তাদের কথা না শোনা হলো তাদের বিরোধিতা করা। কিন্তু আসলে বিষয়টা মোটেও তা না।

হাসান আল-বসরিকে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় যার মা তাকে তার স্ত্রীকে তালাক দিতে বলে। তিনি উত্তর দেনঃ “মায়ের কথা শুনে স্ত্রীকে তালাক দেওয়া মায়ের প্রতি আনুগত্য নয়।”

ইমাম আহমাদ রাহ.-কে এমন এক ব্যক্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয় যারা বাবা তাকে তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ইমাম আহমাদ বলেন, “তাকে তালাক দিও না।” লোকটি এরপর জিজ্ঞেস করল যে কিন্তু উমর রা.-কি তার পুত্র আবদুল্লাহকে বলেননি তার স্ত্রীকে তালাক দিতে?” ইমাম আহমাদ জবাব দিলেন, “আর তোমার বাবা তো উমর ইবনুল খাত্তাব রা.-এর মতো [ন্যায়পরায়ণ] তাই না?”

যেসব নারীর মুখ তিক্ত, যাদের জিহ্বা একটু বেশী চলে, যাদের আদবগত সমস্যা আছে তাদের সাথে কীভাবে চলবেন সে সংক্রান্ত অনেক শিক্ষা রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তালাক এসবের সমাধা হতে পারে না।

যেমন, মহান আল্লাহ বলেছেন,

যারা কুফরি করে তাদের জন্য আল্লাহ নূহের স্ত্রীর ও লূতের স্ত্রীর উদাহরণ পেশ করেন; তারা আমার বান্দাদের মধ্য হতে দু’জন সৎবান্দার অধীনে ছিল, কিন্তু তারা উভয়ে তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, অতঃপর আল্লাহর আযাব হতে রক্ষায় নূহ ও লূত তাদের কোন কাজে আসেনি। বলা হল, ‘তোমরা উভয়ে প্রবেশকারীদের সাথে জাহান্নামে প্রবেশ কর।’  [সুরা তাহরিমঃ ১০]

এই মানুষগুলো ছিলেন নবি। তাদের সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ মানুষ। যাদেরকে আল্লাহ নিজে নির্বাচিত করেছিলেন তাঁর বার্তা মানুষদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এরপরও তাদের স্ত্রী-রা তাদের সাথে প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। নুহ আ.-এর স্ত্রী মানুষকে বলে বেড়াতো যে নুহ আ. একজন পাগল। লুত আ.-এর স্ত্রী তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল মানুষকে বলে দিয়ে যে অতিথিরা শহরের কোথায় আছে।

আল্লাহ বলেন,

অতঃপর আমি তার আহবানে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়াকে, আর তার জন্য তার স্ত্রীকে যোগ্যতা সম্পন্ন করেছিলাম; তারা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা করত, তারা আমাকে ডাকত আশা ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আমার নিকট বিনীত। [সুরা আম্বিয়াঃ ৯০]

তাফসিরের (কুরআনের ব্যাখ্যা) কিছু আলিমদের মতে, তারা উল্লেখ করেছেন যে, হযরত জাকারিয়াহ আলায়হিস সালাম-এর স্ত্রীর অসুস্থতার সমাধান ছিল তার কথা বলার ধরন ও আচরণের মধ্যে। আতা ইবনে রাবাহ এবং মুহাম্মদ ইবনে কাব উল্লেখ করেছেন যে, জাকারিয়া আ.-এর স্ত্রী জাকারিয়া আ.-এর প্রতি কষ্টদায়ক শব্দ ব্যবহার করতেন এবং জাকারিয়া আ.-কে অপমান করতেন। উপরন্তু তিনি সচ্চরিত্রের অধিকারী ছিলেন না। ফলস্বরূপ, আল্লাহ তাকে হিদায়াত দান করেন, তাকে সংশোধন করেন।

কিছু আলিম মনে করেন যে, জাকারিয়াহ আ.-এর স্ত্রীকে আল্লাহ প্রদত্ত নিরাময় ছিল বন্ধ্যা হওয়ার পরেও গর্ভধারণ এবং সন্তান ধারণের ক্ষমতা। ইমাম আশ-শাওকানী বলেছিলেন যে, এটা দ্বাআ  দিয়েছিলেন যে এটি এই সত্যকে অস্বীকার করে না যে আল্লাহ তার খারাপ চরিত্র এবং আলগা জিহ্বাও সংশোধন করেছেন। অন্য কথায়, আল্লাহ তাকে শুধুমাত্র সন্তান ধারণের ক্ষমতাই দেননি যখন সে আগে পারেনি বরং তার নেতিবাচক চরিত্রকে ইতিবাচক চরিত্রে রূপান্তরিত করতেও তাকে সাহায্য করেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে আল্লাহর রহমত শারীরিক এবং আধ্যাত্মিক নিরাময় উভয়কেই ধারণ করে, যা তার সত্তায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে।

লাকিত (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- যে উপদেশ দিয়েছিলেন সেটা সম্পর্কে চিন্তা করুন।

আমি (বর্ণনাকারী লাকিত) বললাম, আল্লাহর রাসুল, আমার একজন স্ত্রী আছে যার জিহ্বায় সমস্যা (ভুল) আছে। অর্থাৎ সে অসম্মানজনক আচরণ করে। তিনি বললেনঃ তাহলে তাকে তালাক দাও। আমি বললামঃ আল্লাহর রাসুল, তিনি আমাকে বেশ কিছু সময় ধরে সঙ্গ দিচ্ছেন। তিনি তার গর্ভে আমার সন্তানও ধারণ করেছেন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ তাহলে তাকে (তোমার আনুগত্য করতে) বলো। যদি তার মধ্যে ভাল কিছু থাকে তবে সে তা করবে (আনুগত্য করবে); আর তোমার স্ত্রীকে প্রহার করো না যেমন তুমি তোমার দাসীকে প্রহার কর। [সুনানু আবু দাউদঃ ১৪২]

এই হাদিসে একজন সাহাবী তার স্ত্রীর খারাপ চরিত্র সম্পর্কে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। তারপর তিনি তাদের সম্পর্কের ভাল দিকটা বুঝতে পারলেন। সেই দিকটা হচ্ছে, তারা একসাথে সন্তান নিয়েছিলেন। তাই মুহাম্মদ (ﷺ) –এর তার জন্য উপদেশ ছিল যে, তিনি যেন তার স্ত্রীকে তার  তার আনুগত্য করতে বলেন এবং তিনি যেন তার স্ত্রীকে আনুগত্য না করলে প্রহার না করেন। যেভাবে মনিব তার দাসীকে প্রহার করে তার আদেশ না মানলে।

আল-ইমাম আবু বকর ইবনে আল-লাবাদ আল-মালিকি (৩৩৩ হি.)

ইমাম আবু বকর এমন এক মহিলার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন যার জিহ্বা ছিল আলগা এবং মহিলাটি জিহ্বার আঘাতে ইমামকে আক্রমণ করতেন। এমনও ঘটে যে একদিন ইমামের স্ত্রী ইমামকে ব্যভিচারী বলেন। তাই ইমামের সঙ্গীরা ইমামকে বললেন যে আপনার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করুন যে উনি বলুক, আপনি কার সাথে ব্যভিচার করেছেন। ইমাম স্ত্রীকে এটা জিজ্ঞেস করলে স্ত্রী বলল দাসীর সাথে। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করা হল, কার দাসীর সাথে? তখন স্ত্রী জবাব দিলেন, তোমার [ইমামের] দাসীর সাথে। তখন ইমামের সঙ্গীরা বললেন যে আপনি স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিন। উনার যা প্রাপ্য আমরা উনাকে তা বুঝিয়ে দেব।

ইমাম আবু বকর বললেন, “আমি ভয় পাচ্ছি যে আমি যদি তাকে তালাক দেই তাহলে সে অন্য মুসলমানের জন্য পরীক্ষা হয়ে দাঁড়াবে। হয়তো তার অভিযোগের ভিত্তিতে আল্লাহ আমার কাছ থেকে একটি বড় বিপদ দূর করবেন। আমি অনেক মহিলাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহ তাকেই আমার স্ত্রী হিসাবে পছন্দ করেছিলেন। তাই তাকে তালাক দেওয়া কীভাবে আল্লাহর আমাকে দেওয়া অনুগ্রহের প্রতিদান হতে পারে? প্রতিটি মানুষের জীবনে পরীক্ষা থাকে। আমার স্ত্রী আমার জীবনে পরীক্ষাস্বরূপ।

 

ইমাম শাফিয়ি রাহ. বলেন, “আমি প্রায় ৪০ বছর ধরে বিবাহিত দম্পতিদের তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছি। তাদের কেউই বলেনি যে এই সম্পর্কটা সহজ ছিল।”

 

Leave a Comment

betvisa