ইসলাম ধর্মের সার্বজনীনতা

ইসলামের পূর্বে সকল আসমানি ধর্ম কোনো না কোনো জাতির জন্য নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য বিধিবদ্ধ ছিল। এ সকল ধর্মের পরিসীমাও ছিল সীমাবদ্ধ। উদাহরণত তখন সে ধর্মটি একটি প্রজন্মের জন্য উপযোগী হতো অথবা তা মানুষের মধ্যকার নির্দিষ্ট এক জাতির জন্য উপযোগী ছিল।

কিন্তু ইসলাম এমন এক বৈশিষ্ট্যে দীপ্তিমান, যা মানব অস্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যশীল। ইসলাম সকল মানুষের জন্য; চাই সে মানুষ যে জাতি বা যে বংশ কিংবা যে সময়ের-ই হোক না কেন। কারণ, ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সব সময়ের জন্য উপযোগী। সবার জন্য এক অনুপম আদর্শ। আল্লাহ তাআলা সমগ্র মানবজাতির জন্য ইসলামের প্রযোজ্যতা সম্পর্কে ইরশাদ করেন,

قُلۡ یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰهِ اِلَیۡکُمۡ جَمِیۡعَۨا الَّذِیۡ لَهٗ مُلۡکُ السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ ۚ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ یُحۡیٖ وَ یُمِیۡتُ ۪ فَاٰمِنُوۡا بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهِ النَّبِیِّ الۡاُمِّیِّ الَّذِیۡ یُؤۡمِنُ بِاللّٰهِ وَ کَلِمٰتِهٖ وَ اتَّبِعُوۡهُ لَعَلَّکُمۡ تَهۡتَدُوۡنَ ﴿۱۵۸﴾

বল, ‘হে মানুষ, আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল, যার রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব। তিনি ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু দেন। সুতরাং তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আন ও তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর প্রতি, যে আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহের প্রতি ঈমান রাখে। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে। [সুরা আরাফঃ ১৫৮]

 وَ مَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ اِلَّا کَآفَّۃً لِّلنَّاسِ بَشِیۡرًا وَّ نَذِیۡرًا وَّ لٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ﴿۲۸﴾

‘আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি। [সুরা সাবাঃ ২৮]

ইসলাম তার মহান জীবনব্যবস্থার কারণে সকল প্রথাপ্রীতি, জাতীয়তা ও দেশচেতনাকে ডিঙিয়ে মানবতার জন্য এক অনুপম আদর্শ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা নিয়ে এসেছে, যা সকলের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। ইসলাম সমগ্র মানবতার জন্য একটি উৎকর্ষ জীবনব্যবস্থা হিসাবে সর্বদা বিরাজমান থাকবে। তার সামনে যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক না কেন, ইসলামের অনুসারী ও দায়িগণ যত বাধা-প্রতিবাদেরই সম্মুখীন হন না কেন, কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাম স্বমহিমায় চিরউজ্জ্বল থাকবে।

এ সকল বাধা সত্ত্বেও ইসলাম সদা মানবতার ধর্মরূপেই বিদ্যমান থাকবে। তাই ইসলাম ও মানবতার মাঝে কোনো কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। যেমন : রীতি-নীতি, আইন-কানুন, দেশ ও সময়ের ভিন্নতাসহ বিভিন্ন বাধা। ইসলাম এ সকল বস্তুর কোনোরূপ স্বীকৃতিই দেয় না; বরং ইসলামের ডাক হলো প্রকৃত মানবতার প্রতি, যাতে পৃথিবীকে একটি পরিশুদ্ধরূপে নিয়ে যাওয়া যায়। ইসলামের আহ্বান হলো, মানুষের মন-মানসিকতাকে পরিশুদ্ধ করার প্রতি, যেন তার মাঝে চিন্তার ঔজ্জ্বল্যের মতো অমূল্য সম্পদকে নিকৃষ্ট চিন্তাধারার স্থানে প্রতিস্থাপিত করা যায়। এ ছাড়াও ইসলামের দাওয়াত হলো, সমাজের বিভিন্ন অংশে বিরাজমান কুপ্রথা, কুসংস্কার ও খারাপ অবস্থার সংশোধনের প্রতি। যাতে প্রত্যেক ময়লা-আবর্জনা, নাপাকি ও ফাসাদ থেকে পৃথিবীকে সংশোধন করা যায়।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :

 یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اِنَّا خَلَقۡنٰکُمۡ مِّنۡ ذَکَرٍ وَّ اُنۡثٰی وَ جَعَلۡنٰکُمۡ شُعُوۡبًا وَّ قَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوۡا ؕ اِنَّ اَکۡرَمَکُمۡ عِنۡدَ اللّٰهِ اَتۡقٰکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰهَ عَلِیۡمٌ خَبِیۡرٌ ﴿۱۳﴾

“হে মানবজাতি, আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে। এরপরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক আল্লাহভীরু।” [সুরা হুজুরাতঃ ১৩]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন :

 یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ قَدۡ جَآءَتۡکُمۡ مَّوۡعِظَۃٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَ شِفَآءٌ لِّمَا فِی الصُّدُوۡرِ ۬ۙ وَ هُدًی وَّ رَحۡمَۃٌ لِّلۡمُؤۡمِنِیۡنَ ﴿۵۷﴾

“হে মানবজাতি, তোমাদের কাছে তোমাদের রবের তরফ হতে সমাগত হয়েছে উপদেশ, অন্তরস্থ রোগের শিফা এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।” [সুরা ইউনুসঃ ৫৭]

ইসলামের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, তা সকল ধর্মের ওপর বিজয়ী থাকবে। জীবন অবসানের চরম মুহূর্তটি পর্যন্ত এর প্রতি আনুগত্য করে চলতে হবে। এ ধর্মটিই সমগ্র মানবতার পালনীয় একমাত্র ধর্ম। অন্য কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ অনুসরণ বা পালন করার অবকাশ নেই। কেননা, অন্যান্য আসমানি ধর্মের ওপর এর মর্যাদা চিরন্তন। ইসলাম অন্যান্য আসমানি ধর্মের সত্যায়নকারী। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় ইসলামের মৌলিক ভিত্তিসমূহের অংশ-বিশেষ উল্লেখ করে বলেন :

 وَ اَنۡزَلۡنَاۤ اِلَیۡکَ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡهِ مِنَ الۡکِتٰبِ وَ مُهَیۡمِنًا عَلَیۡهِ فَاحۡکُمۡ بَیۡنَهُمۡ بِمَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰهُ وَ لَا تَتَّبِعۡ اَهۡوَآءَهُمۡ عَمَّا جَآءَکَ مِنَ الۡحَقِّ ؕ لِکُلٍّ جَعَلۡنَا مِنۡکُمۡ شِرۡعَۃً وَّ مِنۡهَاجًا ؕ وَ لَوۡ شَآءَ اللّٰهُ لَجَعَلَکُمۡ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً وَّ لٰکِنۡ لِّیَبۡلُوَکُمۡ فِیۡ مَاۤ اٰتٰىکُمۡ فَاسۡتَبِقُوا الۡخَیۡرٰتِ ؕ اِلَی اللّٰهِ مَرۡجِعُکُمۡ جَمِیۡعًا فَیُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ فِیۡهِ تَخۡتَلِفُوۡنَ ﴿ۙ۴۸﴾

আর আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি সত্যগ্রন্থ, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর বিষয়বস্তুর সংরক্ষক। সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তুমি তার মাধ্যমে ফয়সালা কর এবং তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ত্যাগ করে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি শরীআত ও স্পষ্ট পন্থা এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে তোমাদেরকে এক উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং তোমরা ভাল কাজে প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহরই দিকে তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন, যা নিয়ে তোমরা মতবিরোধ করতে।” [সুরা আল মায়িদাঃ ৪৮]

প্রত্যেক আসমানী গ্রন্থ তার পূর্বোক্ত গ্রন্থের সত্যায়ন করে। অনুরূপ কুরআনও পূর্বোক্ত সমস্ত (আসমানী) গ্রন্থের সত্যায়ন করে। আর সত্যায়নের অর্থ হচ্ছে; সমস্ত গ্রন্থ আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু কুরআন সত্যের সাক্ষ্যপ্রদানকারী হওয়ার সাথে সাথে সংরক্ষক, বিশ্বস্ত ও প্রভাবশালী গ্রন্থ। অর্থাৎ পূর্বোক্ত গ্রন্থগুলিতে পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয়েছে; কিন্তু কুরআন এ থেকে সুরক্ষিত আছে। আর এই জন্যই কুরআনের ফায়সালাই সত্য বিবেচিত হবে; কুরআন যাকে সঠিক বলে বিবেচনা করবে, সেটাই সঠিক হিসাবে গণ্য হবে। আর বাকী সবই বাতিল বলে বিবেচিত হবে।

অন্যান্য জীবনব্যবস্থা, জাতীয়তা, আইন-কানুন ও ধর্মের ওপর ইসলামকে কর্তৃত্ব প্রদান ও বিজয়ী করা সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :

هُوَ الَّذِیۡۤ اَرۡسَلَ رَسُوۡلَهٗ بِالۡهُدٰی وَ دِیۡنِ الۡحَقِّ لِیُظۡهِرَهٗ عَلَی الدِّیۡنِ کُلِّهٖ وَ لَوۡ کَرِهَ الۡمُشۡرِکُوۡنَ ﴿۹﴾ یُرِیۡدُوۡنَ لِیُطۡفِـُٔوۡا نُوۡرَ اللّٰهِ بِاَفۡوَاهِهِمۡ وَ اللّٰهُ مُتِمُّ نُوۡرِهٖ وَ لَوۡ کَرِهَ الۡکٰفِرُوۡنَ ﴿۸﴾

“তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূরকে পূর্ণতাদানকারী। যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। তিনিই তাঁর রাসুলকে প্রেরণ করেছেন হিদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে। যাতে সকল দ্বীনের ওপর একে বিজয়ী করেন; যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” [সুরা আস সফঃ ৯]

আল্লাহর ‘নূর’ (জ্যোতি) অর্থঃ কুরআন, ইসলাম, মুহাম্মাদ (সাঃ) কিংবা দলীল-প্রমাণাদি। ‘মুখ দিয়ে নিভিয়ে দেওয়া’ মানে তাদের সেই সব কটূক্তি ও নিন্দনীয় কথাবার্তা যা তাদের মুখ থেকে বের হয়, তা দিয়ে তারা ঐ জ্যোতিকে প্রতিহত করতে চায়!

আল্লাহ সারা বিশ্বে তার প্রসার ঘটাবেন এবং অন্য সমস্ত ধর্মের উপর তাকে জয়যুক্ত করবেন। দলীল-প্রমাণের দিক দিয়ে অথবা পার্থিব জয়ের দিক দিয়ে কিংবা উভয় দিক দিয়ে।

ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম মানুষের স্বভাবধর্ম। এখানে গোত্রপ্রীতি, বর্ণবাদ, বংশীয় আভিজাত্য, ভাষা বিভেদ, জাতীয়তা ও দেশচেতনার কোনো স্থান নেই। ইসলাম কোনো জাতির মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। যেমনটা ইয়াহুদি ও খ্রিষ্টান; তারা ছিল বিশেষ দুটি জাতি। তাদের জন্য আনীত ধর্ম তাদের জাতির মাঝেই নির্দিষ্ট ছিল। কিন্তু ইসলাম সমগ্র বিশ্বের জন্য, সকল মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ। ইসলাম সমগ্র মানবতার জন্য এক সর্বজনীন ধর্ম।

বি.দ্রঃ মুফতি তারেকুজ্জামান রচিত “ইসলামী জীবনব্যবস্থা” অবলম্বনে রচিত।

Leave a Comment