অনুপমা

অনুপমা

“অনুপমা” গল্পটা ছোট একটা মেয়ের জীবন গল্প এবং তার সাথে আমার মায়ের সংগ্রাম এর গল্প হতে পারে। আমার মায়ের ১৮ বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। তিনি সবে মাত্র এইচ এস সি পাশ করেছিলেন তখন।পড়াশোনায় অনেক আগ্রহ ছিলো তার এবং ভালো ছাত্রী হিসেবে পরিচিত ছিলো তার অনেক।বিয়ের পর পড়াশোনা করতে চাইলেও সেটা তিনি পারেন নি। সে সেময় বিয়ের পর পড়াশোনা টা কোন ভাবেই শ্বশুর পক্ষের মানুষজন মেনে নিতেন না।বিয়ের ১ বছর পর প্রথম সন্তান জন্ম দেন, কন্যা সন্তান।পর পর দুজন কন্যা সন্তান হবার পর আমার মায়ের একজন পুত্র সন্তান হয়েছিলেন কিন্তু সন্তান টি মারা যান।কিছু জটিলতার কারনে মৃত্যু ঘটেছিল। এবং এর পরই আমার জন্ম হয়েছিল।

স্পষ্ট মনে আছে আমি বারবার শুনেছিলাম আমার জন্মের পর আমারো বেঁচে থাকার কথা ছিলো না এবং সকলেই ধরে নিয়েছিলেন তাই যে আমি বাঁচবো না। শুধু মাত্র আমার মা এটা ভাবেন নাই। আমি আল্লাহর রহমতেই পৃথিবীতে থেকে যাই।আমার মায়ের শ্বাশুড়ি তথাপি আমার দাদী আমাকে দেখেননি শুধু মাত্র আমি মেয়ে হয়ে আবার জন্ম নিয়েছি বলে। আমার বাবার আশা ছিলেন আমি ছেলে হবো কিন্তু আশা টা পূরন হয়নি।তবে এ নিয়ে বাবার বিশেষ কোন দুঃখ ছিলো না। কিন্তু দাদীর কথার অবাধ্যে তখন কেউ যেতে পারতো না। আমার মায়ের একমাত্র সিজার করে জন্ম নেয়া সন্তান আমি। এবং আমার দাদী এ নিয়ে কটাক্ষ কম করেন নি আমার মা কে।আমার দাদী তার বড় কন্যা অর্থাৎ আমার বড় ফুপু কে দিয়ে দিতে বলেছিলেন আমাকে।কিন্তু আমার মা জেদ করে শুধু মাত্র এক লড়াই করে তিনি আমাকে বড় করে তুলছিলেন।তার কাছে সবসময় মনে হতো আমি আলাদা এবং তার যে সকল স্বপ্ন তিনি পূরণ করতে পারেন নি সেটা আমি করবো।

অনেক যন্ত্রনা তো সহ্য করতে হয়েছেই একারনে তাকে।আমার ছোট থেকে অসম্ভব রাগ ছিলো ডাক্তার বলে দিয়েছিলেন এটা হরমোনাল সমস্যা। অল্পতে রেগে যাওয়া আমার স্বভাবে আছে। দাদীর সেই কটাক্ষ করা কথা একবার নিতে পারিনি আমি আমি উত্তর দিয়ে ফেলেছিলাম এবং সেসময় এটার জন্য আমার মাকে যে পরিমান কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল সেটা সেদিন নিজের চোখে দেখেছি।আমি দেখেছি আমার মায়ের কান্না আমার জন্য আমি দেখেছি একা তিনি কিভাবে আমাকে বাঁচিয়ে ছিলেন সেদিন।আমি ছোট থাকতে বুঝে গিয়েছিলাম মেয়ে হতে হলে আলাদা হয়ে চলতে হবে,সব সহ্য করা শিখতে হবে।ছোট বেলায় পড়াশোনায় ভালো ছিলাম ক্লাসের “গুড গার্ল” যাকে বলে তাই ছিলাম।

আমার দাদীর সেই সাফল্য কখনো পছন্দ ছিলো না।আমার বাবা তার ব্যবসা নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতেন যে আমাদের সময় দেবার কোন সুযোগ ছিলো না। এবং তার সাথেও আমার অনেক দুরত্ব তৈরি হয়েছিল। এভাবেই দিন চলছিল।৫ম শ্রেনীতে পড়া অবস্থায় আমার বাবার পরিচিত একজন মানুষ শিক্ষক হিসেবে আমাকে পড়াতে আসেন এবং তার কাছেই আমি চাইন্ড এব্যিউস এর স্বীকার হই। প্রথমে ব্যাপার টা আমি বুঝতাম না খারাপ লাগতো খুব কিন্তু কাউকে বলতে পারিনি।আমি চাপা স্বভাবের ছিলাম এবং ঘটানা মা কে না জানিয়ে অন্য কারন দেখিয়ে আমি স্যার কে বিদায় করেছিলাম।কিন্তু মা তো মা ই হন।

তিনি বুঝেছিলেন কিছু একটা হয়েছে।সেসময় ভয়ংকর সময় গিয়েছিল আমার উপর দিয়ে। আমি প্রচন্ড ভয় পেতাম এবং এক প্রকার ঘৃনা করতে শুরু করেছিলাম আশেপাশের সব কিছুকে।আমার বাবাকে সেই শিক্ষর আমি বেয়াদবি করেছি বলে নালিশ করেছিল এবং আমার বাবা আমার স্কুল বন্ধ করে দিয়েছিলেন।আমি টানা তিন মাস স্কুল যাই নি সব বই খাতা বেঁধে রেখেছিলেন বাবা।আমাকে মাদ্রায় পাঠিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করছিলেন তিনি। সেই মুহূর্তে আমার মা যদি আবার আমার পাশে না থাকতেন সম্ভবত কোন দিন ই এই জায়গায় আসা হতো না। আমার মা তুলনামূলক প্রতিদিন একটা যুদ্ধ করতেন আমার বাবার সাথে।সেসময় আমি মানসিক ভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম সেটা এবং আমার মা আমাকে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন।আমার বাবা এ কারনে আমার মায়ের সাথে প্রচন্ড বাজে ব্যবহার করতেন এবং বলতেন আমার মা বেয়াদব মেয়ে জন্ম দিয়েছেন। আমার মা আমাকে অসম্ভব বিশ্বাস করেন এবং তিনি এটা সবসময় বলতেন আমার মেয়ে কখনো কোন ভুল কিছু করে নাই।সে সেময় আমার জিন্য এবং আমার মায়ের জন্য একটা দুঃসময় ছিলো।

তিনি প্রতিদিন প্রতিটা সময় আমাকে নিয়ে লড়াই করেছেন।একদিকে আমাকে সুস্থ করে তোলা তার সাথে আমাকে আবার স্কুলে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। আমাকে লুকিয়ে তিনি পড়তে দিতেন। স্কুল যেতে দিবে না বলে জেদ করে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছলাম এবং বাবাকে বলেছিলাম আমি যদি মরে যাই তবুও আমি মাদ্রায় যাবো না ওখানে তোমার পরিচিত আরো শিক্ষক থাকবে।তখন আমার সকল বয়স্ক শিক্ষক দের প্রতি ঘৃণা জন্ম নিয়েছিল।শুধু মাত্র আমার মায়ের যুদ্ধ আর আমার জেদ এর কারনে আমাই আবার স্কুল এ যেতে পেরেছিলাম।সেই জন্মেএ পর থেকে মায়ের সাথে আমার এই সংগ্রাম করে এই পর্যনত পৌছানো।আমি আমার জন্য আমার মায়ের কষ্ট সহ্য করা দেখেছি,তাকে কাঁদতে দেখেছি আমাকে জড়িয়ে ধরে।নীরবে তিনি সব সহ্য করে যেতেন আর সকল কন্যাদের আগলে রেখে তাদের সকল প্রয়োজন আবদার তিনি ই মেটাতেন।

বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই তিনি এখনো তার কন্যাদের জন্য সাহসীকতার সাথে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন।সকল যাতনা নিজে সহ্য করে তিনি বড় করে তুলছেন আমাদের।আমার মা এবং পৃথিবীর সকল মা অসম্ভব সাহস এবং বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে এসেছেন। আমরা প্রতিটা সন্তান মায়ের কাছে আজন্ম ঋৃনী।

Reporter: Khairunnesa Takia

By নিজস্ব প্রতিবেদক

রংপুরের অল্প সময়ে গড়ে ওঠা পপুলার অনলাইন পর্টাল রংপুর ডেইলী যেখানে আমরা আমাদের জীবনের সাথে বাস্তবঘনিষ্ট আপডেট সংবাদ সর্বদা পাবলিশ করি। সর্বদা আপডেট পেতে আমাদের পর্টালটি নিয়মিত ভিজিট করুন।

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *