ঘর-গরু সব হারিয়ে সড়কে ঘুরছেন গণি মিয়া

ঘর-গরু সব হারিয়ে সড়কে ঘুরছেন গণি মিয়া

গণি মিয়ার বয়স হয়েছে। স্ত্রী ও ছয় ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সংসার। অভাবের সংসার হলেও দু’বেলা খাবার, নিশ্চিতে ঘুমানোর মতো অবস্থা ছিল। হালের দুটি বলদ ও একটি দুধের গাভীও ছিল। অন্যের জমি বর্গা চাষ করে যে ধান পেতেন তা দিয়ে বছরের কয়েক মাস চলে যেতো। বড় ছেলেও রোজগারি হয়েছে। কখনও মাছ ধরে, কখনও দিনমজুরের কাজ করে।

গণি মিয়ার এই সংসার তছনছ করে দিয়েছে এবারের ভয়াবহ বন্যা। টিনের তৈরি ঘর ভেঙে চুরমার হয়েছে, তিনটি গরু পানিতে ডুবে মারা গেছে, ঘরে ধান-চালসহ যা ছিল সবই নিয়ে গেছে বানের জল।

ষাটোর্ধ্ব গণি মিয়া আর্তনাদ করে বললেন, ‘অত ফানি (এত পানি) কুনুদিন দেখি নাই, চউখর ফলখর লগে সবতা শ্যাষ খরিলাইছে, আমার ঘর গেছে, ফানিত ডুবিয়া মরি গেছে তিনটা গরু। সবতা  হারাইয়া অখন ফতো (পথে) ঘুরিয়ার’।

গণি মিয়ার বাড়ি সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের লম্বাকান্দি গ্রামে। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে কোম্পানীগঞ্জে গেলে দেখা হয় গণি মিয়ার সঙ্গে। স্ত্রী ও সব ছোট মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তিনি উপজেলা সদরের জেগে ওঠা সড়কে এদিক-ওদিক ঘুরছেন। ত্রাণবাহী ট্রাক কিংবা পিকআপভ্যান দেখলে দৌঁড়ে যাচ্ছেন কিছু পাওয়ার আশায়।

গণি মিয়া বলেন, এখন পর্যন্ত ত্রাণ বলতে কিছু চিড়া-মুড়ি, অল্প একটু চিনি আর ছোট এক বোতল পানি পেয়েছি। তিনি বলেন, এসব দিয়ে এক-দুইদিন পেট চললেও সংসার তো চলবে না। ঘর নেই, গরু নেই, ধান-চাল কিছুই নেই।  এই শূন্য সংসারের কি হবে- এ উত্তর জানা নেই গণি মিয়ার।

শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় কেবল গণি মিয়া নয়, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার এরকম লাখো মানুষের সাজানো সংসার একেবারে শূন্য করে দিয়েছে। সব নিয়ে গেছে ভয়াল বন্যা। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে বন্যার ভয়াবহ ক্ষত জেগে উঠছে, আর সব হারানোর আর্তনাদে ভারী হচ্ছে চারিদিক।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, এবারের বন্যায় উপজেলার শতভাগ এলাকা ডুবে গিয়েছিল। উপজেলা সদর, কোম্পানীগঞ্জ-সিলেট মহাসড়কও ছিল কয়েক ফুট পানির নিচে। তিন দিন সবকিছু ডুবে থাকার পর পানি কমতে শুরু করে। উপজেলা সদর, সিলেটের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সড়ক জেগে উঠেছে। তবে গ্রামগুলোতে এখনও অনেকের ঘরে পানি। তারা আশ্রয়কেন্দ্রেই আছেন।

উপজেলাজুড়ে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট।কোম্পানীগঞ্জ থানা বাজারে ৮-১০ জনে সঙ্গেও কথা বলে জানা যায়, ত্রাণ বিতরণে চরম সমন্বয়হীনতা চলছে। সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ সড়কের আশেপাশে যাদের বাড়ি তাদের অনেকে একাধিকবার ত্রাণ পেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ত্রাণ যাচ্ছে না।

ধলাই নদীর পাড়ঘেঁষে কোম্পানীগঞ্জের একটি বড় বাজার। এ বাজারে রয়েছে সব ধরনের পণ্যের দোকান। অনেক ভালো বেচাকেনাও হয়। এবারের বন্যায় ধলাই তীরের এ বাজার ৮-১০ ফুট পানির নিচে চলে যায়। বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, বাজারের পানি নেমে গেছে। তবে দোকান-সড়ক সব কাদামাটি আর ময়লা-আবর্জনায় একাকার। এসব থেকে পঁচা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দোকান মালিক-আর কর্মচারীরা ময়লা-আবর্জনা সরাতে ব্যস্ত।

বাজারের ব্যবসায়ী সুমন মিয়া জানান, তার দোকানের ফ্রিজ, চাল-ডাল, চিনিসহ বিভিন্ন ধরণের অন্তত ১০ লাখ টাকার জিনিস একেবারে নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কিছু স্রোতের টানে ভেসে গেছে। দোকানঘরও ভেঙেছে। তিনি বলেন, এই বাজারের সব ব্যবসায়ীই সর্বস্ব হারিয়েছেন। অনেকের বাড়িঘরও গেছে। সরকারি সহায়তা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।

কোম্পানীগঞ্জ থানা বাজারে মাছ বেচে সংসার চালাতেন মতিউর রহমান (৪৫)। স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ নয়জনের সংসার। বিভিন্ন হাওর থেকে মাছ কিনে এনে বাজারে বেচে যে আয় হতো তা দিয়ে সংসার চলতো। কিন্তু প্রায় ৬ মাস আগে বাজারেই মাছ বিক্রিতে থাকা অবস্থায় একটি মালবাহী পিকআপভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মতিউরের পায়ের ওপর দিয়ে চলে যায়। ভেঙে যায় একটি পা। ওই গাড়ির মালিকের কিছু সহায়তা ও নিজের টাকা দিয়ে অনেক দিন চিকিৎসা করে কিছুটা সুস্থ হয়েছেন। তবে এখন অন্যের সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারেন না। তাই মাছ বেচাও বন্ধ। অভাব-অনটনে চলছে সংসার। এই কষ্টের মধ্যেই এবারের ভয়াবহ বন্যা মতিউরের টিন আর বাঁশ-বেতের ঘরটিও ভাসিয়ে নিয়েছে। মতিউরের বাড়ি কোম্পানীগঞ্জের কাঠালবাড়ি গ্রামে। ওই গ্রামের সবার বাড়িতেই পানি। তারা আশ্রয় নিয়েছেন স্থানীয় একটি মাদ্রাসার আশ্রয়কেন্দ্রে।

মতিউর বলেন, ‘আমার পা নেই, এখন ঘরও নেই। বউ-বাচ্চা নিয়ে আমি কোথায় যাব’।

কোম্পানীগঞ্জের শিমুলতলা গ্রামের কালা মিয়া, হোসনে আরা বেগম, কাঠালবাড়ি গ্রামের সাত্তার মিয়া, ইসলামপুর গ্রামের আনোয়ারা বেগমসহ আরও অনেকে বাড়িতে ডুবে থাকা ধান এনে কোম্পানীগঞ্জ-সিলেট সড়কে এবং উপজেলা সদরের নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবনের ছাদে শুকাচ্ছেন। তারা জানান, ঘরে যে চাল ছিল তা ভিজে যাওয়ায় ফেলে দিয়েছেন। আর ধানগুলো এনে রোদে শুকাচ্ছেন যদি কিছু চাল পাওয়া যায় এই আশায়। তবে রোদে শুকাতে দেওয়ার পর ধান থেকে যে উৎকট গন্ধ বের হচ্ছে, তাতে এই ধান থেকে যে চাল পাওয়া যাবে- তা খাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে তারা সন্দিহান।

তারা জানান, প্রত্যেকের ২-৩টি গরুও রয়েছে। গরুগুলোও না খেয়ে আছে। একটু খড়কুটো পাওয়া যাচ্ছে না গরুকে খাওয়ানোর জন্য। কেউ কেউ অনেক দূর থেকে চড়া দামে খড়, ঘাস কিনে আনছেন।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লুসিকান্ত হাজং দেশ রূপান্তরকে বলেন, বন্যা ছিল ভয়াবহ। পুরো উপজেলা ডুবে গিয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্থদের উদ্ধার ও খাদ্য সহায়তায় এখন প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা করে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রংপুর ডেইলী রংপুরের সবচেয়ে আপডেট সংবাদ দেশ ও আন্তজার্তিক নিউজ প্রকাশে বাধ্য থাকিবে। রংপুরের সব রকমের নিউজ পেতে রংপুর ডেইলী ভিজিট করুন